এম. এ. বাকী বিল্লাহ :
দীর্ঘ আন্দোলন, জনদাবি ও প্রত্যাশার প্রেক্ষাপটে ২০০৯ সালে ভৈরবকে বাংলাদেশের ৬৫তম জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ভৈরববাসীর আনন্দ যেন সীমা মানেনি—সারা শহরজুড়ে উল্লাস, মিছিল, আনন্দ র্যালি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। জেলা ঘোষণার খবরের পরপরই কিশোরগঞ্জ সদরে “অখণ্ডতা রক্ষার” নামে এক অযৌক্তিক আন্দোলন শুরু হয়। রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ ও প্রশাসনিক টানাপোড়েনের মধ্যে আটকে যায় ভৈরবের জেলাকরণ প্রক্রিয়া। অথচ সরকারের পক্ষ থেকেই তখন একটি ভৈরব জেলা বাস্তবায়ন কমিটি পর্যন্ত গঠন করা হয়েছিল—অর্থাৎ, জেলা গঠনের প্রশাসনিক ভিত্তি তৈরি হয়েই গিয়েছিল।
এরপর কেটে গেছে এক যুগেরও বেশি সময়। তবুও ভৈরববাসী সেই আশায় বুক বেঁধে আছে। কারণ এই দাবি শুধুই আবেগের নয়, এটি বাস্তবতার উপর দাঁড়িয়ে থাকা এক ন্যায্য ও সময়োপযোগী দাবি। বর্তমানে যখন জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনায় কিশোরগঞ্জ জেলাকে ঢাকা বিভাগ থেকে কর্তন করে ময়মনসিংহ বিভাগে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা সামনে এসেছে, তখন ভৈরব জেলা বাস্তবায়নের আন্দোলন আবারও নতুন করে জোর পেয়েছে। ভৈরববাসী যুক্তি—ভৌগোলিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সব দিক থেকেই ভৈরবের স্বাভাবিক অবস্থান ঢাকা বিভাগেই।
ভৈরব বাংলাদেশের অন্যতম কৌশলগত অর্থনৈতিক অঞ্চল। এটি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ-জংশনগুলোর একটি। রেল, সড়ক ও নৌপথ—এই তিন মাধ্যমেই ভৈরবকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এখানে রয়েছে ভৈরব রেলওয়ে জংশন, নদীবন্দর, জাতীয় মহাসড়ক, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও শিল্পাঞ্চল। আশুগঞ্জ বন্দর ও ভৈরব-আশুগঞ্জ শিল্পবেল্ট মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের পূর্ব-মধ্যাঞ্চলের অর্থনৈতিক হৃদপিণ্ডে পরিণত হয়েছে। এইসব অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক সক্ষমতা কোনো উপজেলাভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামোয় কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন। তাই একটি পূর্ণাঙ্গ জেলা প্রশাসনই হতে পারে এই অঞ্চলের উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার কার্যকর সমাধান।
ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক দিক থেকেও ভৈরব জেলা গঠনের যৌক্তিকতা সুস্পষ্ট। ভৈরব উপজেলা কেন্দ্র করে প্রতিবেশী কুলিয়ারচর, বাজিতপুর, কটিয়াদি এবং রায়পুরা উপজেলার পূর্বাংশ (বিশেষ করে নদী সংলগ্ন ইউনিয়নগুলো) নিয়ে নতুন ভৈরব জেলা গঠন করা যেতে পারে। এই চারটি উপজেলা ভৈরবকে ঘিরে এমন এক ভৌগোলিক অবস্থান তৈরি করেছে যা প্রশাসনিকভাবে সহজে পরিচালনাযোগ্য। পাশাপাশি এই অঞ্চলগুলোর মানুষের জীবনধারা, ভাষা, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যিক যোগাযোগও ভৈরবকেন্দ্রিক।
ভৈরব শহরের জনসংখ্যা ও নগরায়নের হারও জেলার মর্যাদা পাওয়ার উপযুক্ত। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ভৈরব পৌরসভা জনঘনত্বের দিক থেকে দেশের অন্যতম ব্যস্ততম পৌর এলাকা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প ও বাণিজ্যের দ্রুত বিকাশ ভৈরবকে ইতোমধ্যেই একটি আঞ্চলিক প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অপরদিকে কিশোরগঞ্জ সদর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ভৈরবের মানুষকে প্রতিনিয়ত জেলা শহরে যাতায়াতে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ভূমি অফিস, আদালত, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা উন্নয়ন কার্যক্রমের সেবাগ্রহণে এই দূরত্ব এখন একপ্রকার সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।
ভৈরবের জেলাকরণ তাই কেবল একটি প্রশাসনিক বিভাজন নয়, এটি জনগণের নাগরিক সেবায় সরাসরি প্রবেশাধিকারের প্রশ্ন। নতুন জেলা গঠনের মাধ্যমে এই অঞ্চলের মানুষ তাদের অধিকার ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে। তাছাড়া, ভৈরব জেলা গঠনের মাধ্যমে ঢাকা বিভাগের পূর্ব সীমান্তে একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা হবে, যা অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অবশ্যই, জেলা গঠনের পথে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকবে বিশেষত স্থানীয় রাজনৈতিক বিভাজন ও প্রশাসনিক সীমারেখা নির্ধারণের জটিলতা। কিন্তু এই সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে। ২০০৯ সালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন প্রয়োজন সরকারিভাবে পুনরায় ‘ভৈরব জেলা বাস্তবায়ন কমিটি’ গঠন করা এবং পূর্ববর্তী প্রস্তাবনা পুনর্মূল্যায়ন করা। পাশাপাশি জনমত যাচাই, তথ্যভিত্তিক নকশা প্রস্তুত ও জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভৈরব জেলাকে দ্রুত বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
সবশেষে, একটি কথা স্পষ্ট ভৈরব জেলা গঠনের দাবি আবেগনির্ভর নয়; এটি প্রশাসনিক যুক্তি, অর্থনৈতিক প্রয়োজন এবং জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের এক বাস্তব অনিবার্যতা। ভৈরবকে জেলা ঘোষণা করে ঢাকা বিভাগে অন্তর্ভুক্ত রাখা হবে শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি হবে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ—যা রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়ন প্রবাহকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও গণমুখী করে তুলবে। ভৈরববাসীর আকাঙ্ক্ষা তাই আজও একটাই “ভৈরব হোক বাংলাদেশের ৬৫তম জেলা, এবং তা অন্তর্ভুক্ত থাকুক বিভাগ ঢাকায়।”
লেখক-প্রোগ্রাম অফিসার, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়।