ভাষাশহীদ আব্দুল জব্বারের স্মৃতি রক্ষায় কার্যকরী উদ্যোগ প্রয়োজন

জাতীয় প্রচ্ছদ সারাদেশ
Spread the love

নাবিলা আফরিন, হালুয়াঘাট (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি :

যাদের আত্মত্যাগের জন্য বাংলা ভাষা আজ রাষ্ট্রভাষা, ভাষা আন্দোলনের তারিখ ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বে পরিচিত; সেইসব ভাষাশহিদের মধ্যে অন্যতম আবদুল জব্বার। ভাষা আন্দোলনে অনবদ্য ভূমিকা রাখায় শহীদ আবদুল জব্বারকে বাংলাদেশ সরকার ২০০০ সালে একুশে পদক (মরণোত্তর) প্রদান করে।

আবদুল জব্বারের জন্ম ১৩২৬ বঙ্গাব্দের ২৬ আশ্বিন তারিখে (১৯১৯ খ্রিস্টাব্দ), ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার পাঁচুয়া গ্রামে। তার পিতা হাসান আলী এবং মা সাফাতুন নেছা। অন্য ভাইরা হচ্ছেন- আবদুল কাদের ও এএইচএম আসাদ (নয়ন)। স্থানীয় খারুয়া মুকুন্দ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কিছুকাল পড়াশোনার পর দারিদ্র্যের কারণে লেখাপড়া বন্ধ করে পিতাকে কৃষিকাজে সাহায্য করেন আবদুল জব্বার। এ সময় আবদুল জব্বার চাকরি নেন আনসার বাহিনীতে। পাশাপাশি স্থানীয় লক্ষ্মীবাজারে মুদি দোকানও দিয়েছিলেন। তখন আবদুল জব্বার আনসার বাহিনীর প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন।

১৯৫০ সালের শেষ দিকে পরিবারের সবাইকে নিয়ে হালুয়াঘাট উপজেলার গাজীরভিটা ইউনিয়নের শিমুলকুচি গ্রামে চলে আসেন। প্রাপ্তবয়স্ক হলে বিয়ে করেন আমেনা খাতুনকে। আমেনা-জব্বার দম্পতির নূরুল ইসলাম বাদল নামে এক পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। পুত্র জন্ম হওয়ার কিছুদিন পর তার শাশুড়ি ক্যানসারে আক্রান্ত হন। তাকে নিয়ে ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় আসেন।

হাসপাতালে রোগী ভর্তি করে আবদুল জব্বার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ছাত্রদের আবাসস্থল (ছাত্র ব্যারাক) গফরগাঁও নিবাসী হুরমত আলীর রুমে (২০/৮) ওঠেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করে। মিছিলটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে এলে জব্বার তাতে যোগদান করেন। এ সময় আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ গুলিবর্ষণ করে এবং জব্বার গুলিবিদ্ধ হন। ছাত্ররা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা জব্বারকে মৃত ঘোষণা করেন। তাকে যারা হাসপাতালে নিয়ে যান, তাদের মধ্যে ছিলেন ২০/৯ নম্বর কক্ষের সিরাজুল হক। পরবর্তী সময়ে জব্বারকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।

আব্দুল জব্বারের মৃত্যুর পর বিধবা আমেনা খাতুনকে বিয়ে করেন তার সহোদর আবদুল কাদের। আমেনা খাতুন ও ছেলে নুরুল ইসলাম বাদল বসবাস করতে থাকেন এই গ্রামে। আমেনা-কাদের দম্পতির রফিকুল্লাহ্, আতিকুল্লাহ্ ও রাশেদা খাতুন নামে তিন সন্তান রয়েছে। বর্তমানে রাজধানী তেঁজগাওয়ের তেজকুনিপাড়ায় প্রায় বিধ্বস্ত একটি বাড়িতে থাকেন ভাষাশহিদ আবদুল জব্বারের উত্তরাধিকারীরা। কয়েকটি টিনশেড রুমসহ সাড়ে পাঁচ শতাংশের এই বাড়িটি ১৯৭৩ সালে সরকার ভাষাসৈনিক আবদুল জব্বারের পরিবারের নামে লিজ দেয়। ১৯৭৮ সালে উত্তরাধিকারী হিসেবে বাড়িটি বুঝে পায় তার একমাত্র সন্তান নূরুল ইসলাম বাদল। এর অনেক দিন পরে ১৯৯২ সালে বাড়িটির রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়।

আবদুল জব্বারের সন্তান বাদল শুধু ভাষাশহিদের উত্তরাধিকারীই নন; তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সেনাবাহিনীর সদস্য। নূরুল ইসলাম বাদল তার পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে জীবনযুদ্ধে বেঁচে থাকার লড়াই করেছেন বহুদিন। সব লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে ২০২১ সালের ১৪ অক্টোবর বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বাদলের দুই মেয়ে, এক ছেলে। বড় মেয়ের নাম লুৎফুন নাহার শোভা ও ছোট মেয়ে আফরোজা বেগম রুবা। ছেলের নাম ফারজুল ইসলাম বিজয়। সবাই বিবাহিত।

আবদুল জব্বারের জন্মস্থান গফরগাঁও উপজেলার পাঁচুয়া গ্রামের নাম এখন জব্বার নগর। জব্বার নগরে একটি পাকা সড়ক তৈরি হয়। ২০০৬ সালে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ওই সড়কের প্রবেশমুখে ‘ভাষাশহিদ আব্দুল জব্বার তোরণ’ নির্মিত হয়। তার গ্রামেই গড়ে তোলা হয়েছে ‘ভাষাসৈনিক শহিদ আবদুল জব্বার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। এর পাশেই রয়েছে শহিদ আবদুল জব্বার স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার। এ ছাড়াও গাজীপুরের কালিয়াকৈরে স্থাপিত হয়েছে ‘শহিদ আবদুল জব্বার আনসার ভিডিপি স্কুল অ্যান্ড কলেজ’।

ভাষাশহীদ আব্দুল জব্বারের স্মৃতি রক্ষায় গ্রামের বাড়ি হালুয়াঘাটের গাজীরভিটা ইউনিয়নের শিমুলকুচি গ্রামে ২০০০ সালের দিকে তাঁর ছোট ভাই আবদুল কাদিরের দেওয়া ২৫ শতাংশ জমিতে ‘ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার জামে মসজিদ ও পাঠাগার’ নির্মাণ করা হয়। ২০০৭ সালে গড়ে তোলা হয় ‘ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার ফাউন্ডেশন’। যা ২০১০ সালে মন্ত্রণালয় থেকে নিবন্ধন পায়।

১৯৭৮ সালে মারা যান আব্দুল জব্বারের মা সাফাতুন্নেছা। পরে তাঁকে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়। ২০১১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তারিখে হৃদরোগে মারা যান স্ত্রী আমেনা খাতুন। মৃত্যুর আগে বাড়ির পাশে ২০০৮ সালে জব্বারের স্ত্রী আমেনা খাতুন স্বামীর স্মৃতি রক্ষায় ব্যক্তিগত ৮ হাজার টাকা খরচ করে ছোট আকারে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। সেখানে ২১ ফেব্রুয়ারি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেন করতেন স্থানীয়রা। এই শহীদ মিনার সংস্কারের জন্য ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম বাদল জেলা পরিষদে আবেদন করেন। পরে ২০১০ সালে একটি শহীদ মিনার স্থাপন করে জেলা পরিষদ। কিন্তু সংস্কারের অভাবে এখন প্রায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে শহীদ মিনারটি। ২০১১ সালে মারা যান জব্বারের স্ত্রী আমেনা খাতুন। পরে তাঁকে জব্বার জামে মসজিদের পাশেই সমাহিত করা হয়। তাঁর ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম মারা যান ২০২১ সালে। পরে তাঁকে সেই বাড়িতেই দাফন করা হয়। কবরটি বাঁশের বেড়া দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

একুশে ফেব্রুয়ারি ও আগের দিন মানুষজন ভাষাশহীদের খোঁজখবর নিলেও ২২ তারিখ থেকেই তাঁর কথা মনে থাকে না কারও। ৮০০ মিটার কাঁচা সড়ক পাড়ি দিয়ে শহীদ আবদুল জব্বারের ছেলের বাড়িতে যেতে হয়। এই গ্রামে তাঁর মা, স্ত্রী ও সন্তানের কবর পড়ে আছে অযত্নে। কেউ দেখিয়ে না দিলে চেনার উপায় নেই। তাঁর শেষ স্মৃতি রক্ষায় বাড়ির পাশে তৈরি শহীদ মিনারটি এখন জরাজীর্ণ। তাঁর স্মৃতি রক্ষায় স্থাপনাগুলো সংস্কার হবে বলে মনে হয় না। আক্ষেপ করে এমন কথা বলেছেন, ভাষাশহীদ আবদুল জব্বারের ভাতিজি রাশিদা বেগম।

হালুয়াঘাট উপজেলার গাজীরভিটা ইউনিয়নের শিমুলকুচি এলাকায় ভাষাশহীদ আবদুল জব্বারের বাড়িতে গেলে আক্ষেপ করেন রাশিদা বেগম জানান, আবদুল জব্বারের ছেলে নুরুল ইসলাম বাদল মারা যাওয়ার পর এই গ্রামেই তাঁর দাফন হয়েছে। তাঁর স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছেন। এই গ্রামে ভাষাশহীদ জব্বারের নামে রয়েছে একটি শহীদ মিনার, একটি মসজিদ, পাঠাগার এবং আবদুল জব্বার স্মৃতি ফাউন্ডেশন। মসজিদটি উপজেলা পরিষদের বরাদ্দে সংস্কার করা হলেও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে তাঁর নামে শহীদ মিনার। জব্বারের নামে করা বিভিন্ন স্থাপনা ও সড়ক সংস্কার করে নতুন প্রজন্মর কাছে তাঁর জীবনী তুলে ধরার দাবি জানান তিনি।

জব্বারের নাতনি আফরোজা আক্তার বলেন, ভাষাশহীদ জব্বারকে তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হলেও তাঁর স্মৃতি রক্ষায় কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু কোনো উদ্যোগ নেই। আমাদের কেউ মূল্যায়নও করেন না। কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধাও পাই না।’

হালুয়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আলীনূর খান বলেন, তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত অর্থবছরে কিছু রাস্তা করে দেওয়া হয়েছে। শহীদ মিনারটি এমন এক জায়গায় নির্মিত যেখানে সংযোগ রাস্তা নেই। তাদের বলছি, মালিকরা যদি জমি দিতে আগ্রহী হয়, এ বছরের বরাদ্দে সড়কটি করে দেওয়া হবে।

শহিদ আবদুল জব্বারের স্মৃতি রক্ষার্থে স্কুল, কলেজ, জাদুঘর, গ্রন্থাগার সবই হয়েছে, কিন্তু হয়নি এগুলোর সঠিক প্রচার, আধুনিকায়ন ও যথাযথ পরিচর্যা। যে কারণে বর্তমান প্রজন্ম ভাষাশহিদ আবদুল জব্বার সম্পর্কে প্রায় অন্ধকারেই আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *