নতুন এমপি-মন্ত্রীদের শপথ আজ

জাতীয় প্রচ্ছদ রাজনীতি
Spread the love

ইয়াহিয়া খান রিজন :

আজ বুধবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণ। সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদ সদস্যদের শপথকক্ষে নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথেরও আয়োজন করা হয়েছে। পরে বিকালে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হবে। বর্ণাঢ্য আয়োজনে শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সরকারের দেশ পরিচালনা ও সংসদীয় কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে আজ। শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ভারত, চীন, পাকিস্তানসহ ১৩ দেশের সরকারপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
শপথ অনুষ্ঠানের লাইভ সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিজয়ী ২৯৭ জন সংসদ সদস্যের (এমপি) গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংবিধান অনুসারে গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণ করতে হয়। এবার এই বিধানের ব্যত্যয় ঘটেছে। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর পদত্যাগ করা এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু জেলে থাকার কারণে সংবিধানের ‘দ্বিতীয় অপশন’ অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করাবেন। আর মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।

সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণের পর নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল বিএনপির সংসদীয় দলের সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় তাদের সংসদীয় দলের নেতা (সংসদ নেতা) নির্বাচন করবেন। এরপর তাদের সংসদীয় দলের নেতা রাষ্ট্রপতির কাছে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন হওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবেন। রাষ্ট্রপতি তখন তাকে নিয়মানুযায়ী প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ দেবেন এবং মন্ত্রিসভা গঠনের আহ্বান জানাবেন। তিনি পরে মন্ত্রিসভার সদস্যদের নির্বাচন করবেন। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন প্রথমে প্রধানমন্ত্রীকে শপথ পাঠ করাবেন। এরপর মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের শপথ পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি। মন্ত্রিপরিষদের শপথ অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করবেন নবনিযুক্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। শপথের পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দপ্তর বণ্টন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। নতুন সরকারের শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে অধ্যাপক ইউনূস নেতৃত্বাধীন ১৮ মাস ৮ দিনের অন্তর্বর্তী সরকারের বিলুপ্তি ঘটবে।

এদিকে সাধারণত মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ বঙ্গভবনের দরবার হলে অনুষ্ঠিত হওয়ার রেওয়াজ। তবে এবার ব্যতিক্রম। বিএনপির চাওয়ায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় খোলা আকাশের নিচে মন্ত্রীদের শপথ পাঠ করানো হবে। সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের শপথ গ্রহণকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তার চাদরে মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সংসদ ভবন সংলগ্ন এলাকা। স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স বা এসএসএফের নিরাপত্তা বলয়ে মন্ত্রীদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানস্থলের প্রস্তুত করা হয়েছে।

জানা গেছে, শপথ অনুষ্ঠানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, নতুন এমপি-মন্ত্রী ও তাদের পরিবার, পদস্থ কর্মকর্তা, কূটনীতিক, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও সুশীল সমাজ, সাংবাদিকসহ প্রায় দেড় হাজার অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

শপথ অনুষ্ঠানের পর যে যে স্থানে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা তারেক রহমান ও সংসদ সদস্যরা যেতে পারেন সেই স্থানগুলো সাজিয়ে তোলা হয়েছে। নতুন এমপিদের স্বাক্ষর ও পরিচয়পত্র প্রদানের জন্য ছবি তুলতে বুথ স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া নবনির্বাচিত সদস্যদের জন্য বরাদ্দকৃত কক্ষগুলোও প্রস্তুত করা হয়েছে।

সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শপথ গ্রহণের জন্য ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা হয়েছে। এবার এমপিদের শপথের সময় তাদের পরিবার বা কোনো অতিথিদের প্রবেশাধিকার থাকছে না।

এদিকে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ২৯৯ আসনের মধ্যে ২৯৭ আসনের ফল গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনে বিএনপি ২০৯ আসনে জয় পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। আর জামায়াতে ইসলামী ৬৮ আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দলে বসতে যাচ্ছে। এদিকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসনে নির্বাচিত হয়েছেন। আজ তিনি ঢাকা-১৭ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন। বগুড়া-৬ আসনটি ছেড়ে দেওয়ায় আসনটি শূন্য ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ফলে আজ ২৯৬ জন সংসদ সদস্য শপথ গ্রহণের কথা রয়েছে।

সংস্কার পরিষদ সদস্যদের শপথের বিষয়ে বিএনপির অবস্থান : এদিকে নির্বাচিতদের দুটি শপথের বিষয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় সংসদ সচিবালয়। সংসদ সদস্যদের শপথের পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হওয়ায় তাদের সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবেও শপথের আয়োজন করা হয়েছে। তবে বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা দ্বিতীয় শপথ নেবেন কিনা, তা নিয়ে সংশয় আছে। কারণ দলটি মনে করে, বিদ্যমান সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ বলে কিছু নেই। বিদ্যমান সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে বিভিন্ন পদের শপথের বিষয়ে বলা আছে। সেখানে সংসদ সদস্যদের শপথের কথা আছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের বিষয় নেই।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ, এটা যদি কনস্টিটিউশনে (সংবিধান) ধারণ হয়, সেই মর্মে অ্যামেন্ডমেন্ট (সংশোধন) হয় এবং সেই শপথ পরিচালনার জন্য সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে ফরম হয়, কে শপথ পাঠ করাবেন সেটা নির্ধারিত হয়, এতগুলো ‘হয়’ (যদি সম্পন্ন হয়), তারপরে (এই শপথ) হলে হতে পারে।

শপথ পড়াতে রাজি হননি কারাবন্দি ডেপুটি স্পিকার : এদিকে সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের (এমপি) শপথ পড়ানোর কথা জাতীয় সংসদের স্পিকারের। দ্বাদশ সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। এমন প্রেক্ষাপটে সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানোর জন্য গত রবিবার জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের আইন প্রণয়ন শাখা-১ থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি বিদায়ী ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুকে চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি শপথ পড়াতে রাজি হননি। যে কারণে আজ সিইসির মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানোর বিকল্প পথ বেছে নিয়েছে সরকার।

শামসুল হক টুকুকে লেখা সংসদ সচিবালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর অনুচ্ছেদ ৫ অনুসারে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৯৭টি নির্বাচনী এলাকার ফলাফল এবং গণভোটের ফলাফল সরকারী গেজেটে ১৩-০২-২০২৬ তারিখে প্রকাশিত হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী সংসদ-সদস্যদের শপথগ্রহণ সম্পর্কিত বিধান হচ্ছে। ‘১৪৮ (২ক)। ১২৩ অনুচ্ছেদের (৩) দফার অধীন অনুষ্ঠিত সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হবার তারিখ হতে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে এই সংবিধানের অধীন এতদুদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা তদুদ্দেশ্যে অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোন ব্যক্তি যে কোন কারণে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ পরিচালনা করতে ব্যর্থ হলে বা না করলে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার উহার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে উক্ত শপথ পাঠ পরিচালনা করবেন, যেন এই সংবিধানের অধীন তিনিই এর জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি।’

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, বিদায়ী স্পিকার শপথ পাঠ পরিচালনার জন্য অনুপস্থিত বা শপথ পাঠ করাতে অসমর্থ, বিধায় নির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের শপথ পাঠ পরিচালনা করবেন বিদায়ী ডেপুটি স্পিকার।

সংশ্লিষ্টসূত্রে জানা গেছে, সংসদ সচিবালয়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রবিবারই কারা কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের এ ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেয়। কারা কর্তৃপক্ষ কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগারে বন্দি বিদায়ী স্পিকার শামসুল হক টুকুকে শপথ পড়ানোর বিষয়ে সংসদ সচিবালয়ের চিঠিটি হস্তান্তর করে। চিঠি পেয়ে তিনি প্যারোলে মুক্ত হয়ে সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রবিবারই বিষয়টি চিঠি দিয়ে সংসদ সচিবালয়কে জানিয়ে দেয়।

নতুন মন্ত্রীদের জন্য প্রস্তুত গাড়ি: আজ মঙ্গলবার বিকালে শপথ নেবেন নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা। শপথ নিয়েই রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী গাড়িতে উঠবেন তারা। আর নতুন সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের জন্য ৩৭টি বাসা প্রস্তুত আছে বলে জানিয়েছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান। প্রস্তুত রাখা হচ্ছে ৩৭টি পুলিশ এস্কর্ট গাড়ি এবং ৩৭ জন গানম্যান। মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যরা সেখানে যাবেন ফ্ল্যাগ ছাড়া ব্যক্তিগত গাড়িতে। আর বের হবেন ফ্লাগ স্টান্ড লাগানো সরকারি গাড়িতে। নতুন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করবে এসএসএফ। আর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টারা শপথ অনুষ্ঠানে যাবেন ফ্লাগ স্টান্ড লাগানো গাড়িতে। আর বের হবেন ফ্লাগ ছাড়া ব্যক্তিগত বাহনে।শপথ নিতে মন্ত্রিসভার সদস্যরা ৪ জন করে অতিথি সঙ্গে নিতে পারবেন। আর সংসদ সদস্যরা সঙ্গে নিতে পারবেন দুজন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *