ইয়াহিয়া খান রিজন :
সম্প্রতি সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে তাদের গ্রেফতারের পর ওয়ান-ইলেভেনের অন্য কুশীলবদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে বিদেশে অবস্থানকারীরা যেমন সতর্ক অবস্থানে চলে গেছেন, পাশাপাশি দেশে অবস্থানকারীরা চলে গেছেন আত্মগোপনে। ওই সময়ের আলোচিত ও বিতর্কিত আরও কয়েকজন কর্মকর্তা ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন; যাদের মধ্যে অনেকেই এখন দেশে আছেন বলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ধারণা করছেন। তাদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে গোয়েন্দা নজরদারিতে আছেন। সরকারের শীর্ষ মহল থেকে সংকেত পাওয়া গেলে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে প্রায় ১৯ বছর আগে গণতান্ত্রিক ধারা ব্যাহত করে সেনাবাহিনীর একটি অংশের সমর্থনে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়েছিল। বিতর্কিত ওই সরকার ‘এক-এগারোর’ সরকার নামে বহুল পরিচিত। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর মধ্যে হঠাৎ ক্ষমতাধর হয়ে উঠা কয়েকজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী সামরিক কর্মকর্তা এবং তাদের বেসামরিক সহযোগীদের নিয়ন্ত্রণে ওই সময় দেশ পরিচালিত হয়েছে। দেশের বৃহৎ দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা ওয়ান-ইলেভেনের সরকার শুরু থেকেই রাজনীতিবিদদের চরিত্র হননের মিশনে নেমেছিল। শুদ্ধি অভিযানের নামে দেশজুড়ে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা এবং ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার ও হয়রানি করা হয়। সে সময় একদল সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা প্রকাশ্যে ও পর্দার আড়ালে থেকে সব কলকাঠি নেড়েছিলেন। কথিত দুর্নীতি প্রতিরোধের নামে তখন অনেকে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন বলে অভিযোগ আছে।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে ওই সময়ে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হয়েছিলেন ফখরুদ্দীন আহমদ। তবে ক্ষমতার মূল কেন্দ্রে ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ। পরবর্তী সময়ে তদন্তসহ সব ঝামেলা এড়াতেই আওয়ামী লীগের সহায়তায় নির্বাসিত জীবন বেছে নিয়েছেন এক-এগারোর অনেক কুশীলব। তাদের মধ্যে অন্যতম ড. ফখরুদ্দীন আহমদ নাগরিকত্ব নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রে। সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদও আছেন যুক্তরাষ্ট্রে।
দীর্ঘ সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার পর অবশেষে গ্রেফতার (২৩ মার্চ, ২৬) হওয়ায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী আবারো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন। ‘এক-এগারোর নেপথ্যের প্রভাবশালী চরিত্র হিসেবে পরিচিত এই সাবেক জেনারেলের গ্রেফতার এখন শুধু একটি আইনি ঘটনা নয়- বরং এটি দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস, ক্ষমতার কাঠামো এবং জবাবদিহিতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
জরুরি অবস্থা জারি ও সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার পেছনে যেসব সামরিক কর্মকর্তা প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, মেজর জেনারেল ( অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী তাদের অন্যতম । তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি ‘গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন। এই কমিটির অধীনে যৌথবাহিনীর মাধ্যমে দেশব্যাপী রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ এবং দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। অবসর-পরবর্তী সময়ে তিনি জনশক্তি রফতানি, রেস্টুরেন্ট ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে যুক্ত হন। তবে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, প্রতারণা এবং বিপুল অর্থপাচারের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে বারবার উঠে এসেছে।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ১৯৭৫ সালে রক্ষীবাহিনী থেকে সেনাবাহিনীতে যোগদানের মাধ্যমে তার নতুন কর্মজীবন শুরু করেন। ধাপে ধাপে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে তিনি নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হন, যা তাকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর কাছাকাছি নিয়ে আসে। এক্ষেত্রে মেজর অব সাঈদ ইসকান্দরের ভায়েরা হওয়ার বিষয়টি সুযোগ হিসেবে নেয়া হয় বলে ধারণা করা হয়। এক-এগারোর সময় তিনি মেজর জেনারেল থেকে পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হন এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে মতবিরোধের জেরে তাকে বদলি করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় এবং অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি ওই দায়িত্বে ছিলেন। অবসরের পর ২০১৮ সালে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন এবং ফেনী-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে সামরিক অ্যাটাশে হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার আরেক আলোচিত কর্মকর্তা ব্রি. জে. (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারী। গণতান্ত্রিক সরকারের জমানায় এক-এগারোর ঘটনাবলির তদন্তের প্রয়োজনে তাকে ডাকা হলেও আর দেশে ফেরেননি। এরপর থেকেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে। এক-এগারোর সময়ে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন ব্রি. জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন। বর্তমানে তিনি দুবাইয়ে অবস্থান করছেন। সূত্র বলছে, গোয়েন্দা চ্যানেলে তাকে দেশে ফেরানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
তৎকালীন ডিজিএফআইয়ের আরেক ক্ষমতাধর কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) সাঈদ জোয়ার্দার দুবাই-কানাডা যাওয়া-আসার মধ্যে আছেন। ওই সময়ের আরেক আলোচিত সামরিক কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চৌধুরী ফজলুল বারী অবস্থান করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে। লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী এক-এগারোর সরকারের সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ এবং একের পর এক মামলা করে আলোচনায় ছিল দুর্নীতি দমন কমিশন। তিনি এখন কোথায় আছেন তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
এক-এগারোর সরকারের নানা ঘটনার সূত্র ধরে সাবেক আরও কয়েকজন কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তাদের মধ্যে মধ্যম পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বর্তমানে দেশে একটি বড় কোম্পানিতে চাকরি করছেন। ওই সময় ডিজিএফআইয়ের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটে কর্মরত ছিলেন তিনি। এই ইউনিটের মূল ক্ষমতাধর ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এটিএম আমিন। এই আমিনের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা গ্রেফতার, নির্যাতনসহ নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ বিএনপির কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে ওই সময় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়েছিল। সূত্র বলছে, এসব ঘটনার বর্ণনায় বারবার এসেছে সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তার নাম। তিনি বৈষম্যবিরোধী হত্যা মামলার আসামি।
ক্ষমতার অপব্যবহার, দেশের প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মাইনাস করে নতুন এক রাজনৈতিক মেরুকরণের চেষ্টা করেছিল এক-এগারোর সরকার। ওই সরকারের নেপথ্যে ভূমিকা পালনকারী কিছু উচ্চাকাঙ্ক্ষী সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার মূল লক্ষ্য ছিল রাজনীতিবিদদের অপদস্ত করে তাদের সম্পর্কে দেশবাসীর কাছে ‘নেগেটিভ পারসেপশন’ তৈরি করা। আর এর মধ্য দিয়ে এক-এগারোর সরকারকে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় রাখার অপচেষ্টা ছিল তাদের। কিন্তু দেশের জনগণ অগণতান্ত্রিক ওই সরকারকে বেশি দিন মেনে নেয়নি। ফলে তাদের সব ষড়যন্ত্র ভেস্তে যায়। এক-এগারোর ওই সরকার শেষ মুহূর্তে এসে আওয়ামী লীগের সঙ্গে এক সমঝোতা চুক্তি করে তাদের রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসিয়ে ‘সেফ এক্সিট নেয়। ফলে পরে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে বিতর্কিত ওই সরকারের কুশীলবদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়। বিতর্কিত ওইসব সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের কেউ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নেন, আবার কেউ দেশ ছেড়ে প্রবাসে আয়েশি জীবনযাপন করছেন। আওয়ামী লীগ প্রায় ১৬ বছর টানা রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকলেও ওইসব বিতর্কিত কর্মকর্তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং সব অপকর্মের দায়মুক্তি দিয়ে গেছে শেখ হাসিনার সরকার।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারও এক-এগারোর কুশীলবদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তবে জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার দেড় মাসের মাথায় এক-এগারোর কুশীলব হিসাবে পরিচিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) মানব পাচার ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের হত্যার পৃথক দুটি মামলায় তাদের গ্রেফতার করে। সাবেক প্রভাবশালী এই দুই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে নিয়ে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদও করা হচ্ছে। এরপর থেকেই আতঙ্কে আছেন এক-এগারোর কুশীলবরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা বলেন, উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশনা পাওয়া গেলে আরও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হবে। তবে ঢালাওভাবে কাউকে গ্রেফতার করা হবে না। তিনি জানান, সে সময়ে ব্যবসায়ী ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে জোর করে অর্থ আদায় এবং তাদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের সঙ্গে সরাসরি দায়ী ছিলেন এমন অপরাধ নিশ্চিত হওয়া গেলেই শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গ্রেফতার করা হবে। এছাড়া প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে জোর করে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকাও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ওই সময় যারা বাড়াবাড়ি করেছেন তাদের ছাড় না দেওয়া হতে পারে বলেও জানান তিনি।
এদিকে আওয়ামী লীগ সরকার এক-এগারোর কুশীলবদের দায়মুক্তি দিলেও তাদের ফৌজদারি অপরাদের বিচারে বাধা নেই বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘ওয়ান ইলেভেনের সরকার সেনা সমর্থিত। সংবিধানে সেনা সমর্থিত সরকার বলতে কিছু নেই। কিন্তু ওই সরকারের সব কর্মকাণ্ড পরবর্তীতে পার্লামেন্টে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। তবে দায়িত্ব পালনে কেউ যদি প্রচলিত আইন ভঙ্গ করে, যেমন নির্যাতন করে তাহলে সুর্নিদিষ্টভাবে সেই নির্যাতনের অভিযোগ আনা যেতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, আমাদের আইনের বিধানই হলো গ্রেফতার করতে পারবেন, তদন্ত করতে পারবেন, রিমান্ডে নিতে পাররেন-কিন্তু নির্যাতন করা যাবে না। তবে নির্যাতন অহরহ হয়ে আসছে। আইন ভঙ্গ করে নির্যাতন করার ক্ষেত্রে অভিযোগ আনা যাবে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক-এগারোর সরকারের সময় যারা নির্যাতন ও দুর্নীতি করেছে তাদের বিরুদ্ধে ওইসব অপরাধে এখনো কোনো মামলা হয়নি। তাদের বিরুদ্ধে অনতিবিলম্বে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা করে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন। তাদের মতে, এক্ষেত্রে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। ভুক্তভোগীরা যেন সুবিচার পান সে বিষয়ে আশ্বস্ত সরকারকেই করতে হবে। এজন্য একটি কমিশনও গঠন করতে পারে বর্তমান সরকার। তবে পুরো বিষয়টিই নির্ভর করছে সরকারের পলিসির ওপর।
জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আব্দুল কাইয়ুম বলেন, এক-এগারোর সময় অবৈধ গ্রেফতার, নির্যাতন, দুর্নীতি, জিম্মি করে অর্থ আদায়সহ বেশ কিছু গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে নির্যাতন ও দুর্নীতি সবচেয়ে বেশি হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ীকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করেছে। বিনা বিচারে হাজতে আটকে রেখে তাদের থেকে টাকা আদায় করে ছেড়েছে। রাজনীতিকরণেরও চেষ্টা করেছে ওই সরকার। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার তাদের বৈধতাই দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ক্রিমিনাল অফেন্স কখনো তামাদি হয় না। কেউ যদি অভিযোগ করে সেক্ষেত্রে অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্ত এবং বিচার হতে পারে। এক-এগারোর সময় কী কী অন্যায় অবিচার হয়েছিল তা নিরূপণে সরকার একটি কমিশনও গঠন করতে পারে। ভুক্তভোগীরা সুনির্দিষ্ট অভিযোগও করতে পারেন। এছাড়া সরকার ইচ্ছা করলে অভিযোগ আহ্বানও করতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইতিমধ্যে সাবেক দুই শীর্ষ কর্মকর্তা গ্রেফতারের পর কেউ কেউ দেশ ছাড়ারও চেষ্টা করছেন। তবে তাদের বিদেশ যাত্রার ওপর রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। ওই কুশীলবরা কেউ বিমানবন্দর অতিক্রম করতে গেলে বাধার মুখে পড়বেন বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গ্রেফতার একটি প্রতীকী ঘটনা। এটি হয়তো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জবাবদিহিতার নতুন অধ্যায় সূচনা করতে পারে- অথবা এটি কেবল আরেকটি রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হয়ে থাকতে পারে। তবে সব কিছু নির্ভর করছে- এই প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আইনের শাসনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় তার ওপর।
কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি প্রবণতা স্পষ্ট- ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে অতীত সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ বিচার খুব কমই সম্পন্ন হয়। এই প্রেক্ষাপটে “ওয়ান-ইলেভেন”-এর বিচার প্রক্রিয়া যদি সত্যিই শুরু হয়, তবে তা হবে একটি বড় পরীক্ষা। কারণ বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রয়োজন হবে- নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন; ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্যগ্রহণ; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা উন্মোচন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণ। অন্যথায়, এই প্রক্রিয়া প্রতিশোধমূলক রাজনীতির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে “ওয়ান-ইলেভেন”-এর বিচার প্রক্রিয়া হতে হবে- সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও প্রমাণভিত্তিক ও স্বচ্ছ।