রেজাউল করিম ভূঁইয়া :
একুশে বইমেলার তৃতীয় দিন ছিল গতকাল (শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি,২৬)। ছুটির দিন সত্ত্বেও মেলায় বিকেলের দিকে আশানুরূপ দর্শনার্থী ছিল না। তবে সন্ধ্যার পরে স্টলে স্টলে কিছু জটলা চোখে পড়েছে।
মেলায় আসা বেশির ভাগ পাঠকেরই বিশেষ আগ্রহ থাকে নতুন বইয়ের দিকে। পছন্দের লেখক বা বিষয়ের নতুন বের হওয়া বইটি হাতে নিতে উন্মুখ থাকেন তাঁরা। তাই ছাপা আর বাঁধাইয়ের পরপরই স্টলে স্টলে কমবেশি নতুন বইয়ের পসরা সাজিয়ে তোলেন প্রকাশকেরা। মেলার সময় তাই প্রেসের কাজেও চলে সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ।
স্টলে স্টলে এরই মধ্যে নতুন বই ওঠা শুরু হয়েছে। তবে এবার নতুন বই প্রকাশের হার বেশ কম হবে, তা আগেই জানা গেছে। কোনো কোনো প্রকাশনী থেকে জানানো হয়েছে, এই মেলায় তাদের নতুন কোনো বই আসছে না।
ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড এবার কয়েকটি নতুন বই নিয়ে এসেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে আলী রীয়াজের ‘সংকটময় যাত্রা: বাংলাদেশের গণতন্ত্রে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ’-এর অনুবাদ। ভাষান্তর করেছেন মোহাম্মাদ সাজ্জাদুর রহমান। আরও আছে মো. আবুল হাশেম মিয়ার লেখা ‘বাংলার কামান’ শিরোনামের ইতিহাসবিষয়ক বই।
ইউপিএলের স্টলে কর্মরত ইফতেখার শাফিন জানান, মেলার শেষ দিকে এসে তাঁদের অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত হয় বলে আলাদা করে কোনো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
বিশ্ব সাহিত্য ভবন এনেছে ভ্রমণবিষয়ক বই ‘পথের পরশে জীবন’। অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী হুমায়ূন কবির ভূঁইয়া দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ান। তাঁর পথে-প্রান্তরের স্মৃতিকথা, গল্প ও ভ্রমণের গল্প উঠে এসেছে বইটিতে। প্রতিষ্ঠানটি আরও এনেছে হামিদুল আলম সখার কবিতার বই ‘স্মৃতির জানালা থেকে’।
বারবার মেলার সময় পাল্টানোর কারণে বিশ্ব সাহিত্য ভবন তেমন নতুন বই ছাপতে পারেনি। তারপরেও উপন্যাস, কবিতা, গবেষণা বিষয়ে আরও কিছু বই আনবে, জানালেন কর্মী কাওসার।
চন্দ্রাবতী একাডেমি এবার শিশুদের কয়েকটি গল্পের বই আনবে। তবে গতকাল পর্যন্ত মেলায় আসেনি কোনটি।
অনুপম প্রকাশনী বেশ কয়েকটি নতুন বই নিয়ে এসেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে মুহম্মদ জাফর ইকবালের বিজ্ঞানভিত্তিক বই ‘ভিন জগতের গ্রহ এক্সোপ্ল্যানেট’। দূর মহাকাশে থাকা পৃথিবীর মতো কিছু বৈশিষ্ট্যঅলা গ্রহকেই বলে এক্সোপ্ল্যানেট। এ ছাড়া শরদিন্দু চট্টোপাধ্যায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অতিপ্রাকৃত গল্পের সংকলন, জহির রায়হানের উপন্যাস সংকলন এনেছে অনুপম।
অনুপমের ম্যানেজার মো. শাহীন বলেন, ‘৩০-৩৫টি নতুন বই থাকছে এবারের মেলায়। এগুলোর মধ্যে ২৮টি বই চলে এসেছে।’
গ্রন্থিক প্রকাশনী নতুন বই ৫টি আনবে। এগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে সহুল আহমদের লেখা ‘ইতিহাস ও বয়ান পাকিস্তান আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’।
একসময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক নূরে আলম সিদ্দিকীর লেখা বই ‘আমার গেছে যে দিন’ এসেছে জ্ঞানকোষ প্রকাশনী থেকে। স্মৃতিচারণামূলক লেখার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির উল্লেখযোগ্য ঘটনার বয়ান পাওয়া যাবে। এবার কল্পকাহিনি, রাজনীতি, থ্রিলারসহ নানা বিষয়ের ১০টির মতো বই আনছে জ্ঞানকোষ।
কথাপ্রকাশ এবার বেশ কিছু বই নিয়ে এসেছে। ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ইউনুছ বললেন, ‘যেভাবে ভাবছিলাম, বিক্রি তার থেকে ভালো চলছে। এখন সেটা আমাদের স্টলের অবস্থানের কারণেও হতে পারে। আমরা এবার ৭০-৮০টি বই নিয়ে আসছি। কথাপ্রকাশের এবারের বইয়ের মধ্যে আছে মো. সফিকুল ইসলামের ‘অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় বাংলার ইতিহাস চর্চার পথিকৃৎ’ এবং আফসানা বেগমের অনুবাদে নোবেলজয়ী সাহিত্যিক নাদিন গর্ডিমারের বই ‘জাম্প অ্যান্ড দ্য আদার স্টোরিজ’।
প্রথমা প্রকাশন এবারের বইমেলা উপলক্ষে বের করেছে জীবনী, মুক্তিযুদ্ধ, প্রবন্ধ, গবেষণা, উপন্যাস, গল্প ইত্যাদি বিষয়ে একাধিক বই। এগুলোর মধ্যে রয়েছে সংস্কৃতিজন সন্জীদা খাতুনের বাবাকে কেন্দ্র করে স্মৃতিচারণা ‘আমার বাবা কাজী মোতাহার হোসেন’, বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নিয়ে আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার বই ‘বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ’, মোরশেদ শফিউল হাসানের ভূমিকা ও সম্পাদনায় নওশের আলী খান ইউসুফজীর ‘বংগীয় মুসলমান’।
তবে বহু প্রকাশনী এবার মেলায় নতুন বই আনতে পারছে না। তারিখ নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা এবং অনেকের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করে শেষদিকে এসে অংশ নেওয়ায় নতুন বই আনা সম্ভব হয়নি। চারুলিপি প্রকাশনের সহকারী ব্যবস্থাপক বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘আমাদের নতুন বই মেলায় আসবে না। নতুন বই করার পরিকল্পনা ছিল ঈদের পরে।’
একই রকম কথা শোনা গেল কাকলী ও অক্ষর প্রকাশনী থেকেও। ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল মেলায় নতুন বই এসেছে ৩৮টি
বেলা ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্মরণ: আহমদ রফিক’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইসমাইল সাদী। আলোচনায় অংশ নেন মোস্তফা তারিকুল আহসান। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক মনসুর মুসা।
প্রবন্ধে ইসমাইল সাদী বলেন, আহমদ রফিক জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেছেন বাংলাদেশের ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বে তিনি ছিলেন সংগঠকের ভূমিকায়।
অধ্যাপক মনসুর মুসা বলেন, আহমদ রফিক শুধু ভাষাসংগ্রামী ছিলেন না, তিনি জীবনসংগ্রামীও ছিলেন। মানুষের জীবনকে উন্নত করার জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন।
‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন প্রাবন্ধিক, গবেষক আহমাদ মাযহার। বিকেল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি পরিবেশন করেন কাজী বুশরা আহমেদ তিথি, ইশরাত শিউলি, জান্নাতুল ফেরদৌস মুক্তা ও নাসিম আহমেদ। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী সালাউদ্দিন আহমেদ, শহীদ কবীর পলাশ, ইয়াকুব আলী খান, নন্দিতা মণ্ডল, অপর্ণা মজুমদার, নুসরাত জাহান জেরিন এবং মো. জাকির হোসেন আখের।