মেস্তা থেকে সুপারফুড : রোজেলার জয়যাত্রা ও বাংলাদেশের অবস্থান

অন্যান্য
Spread the love

কৃষিবিদ ড. মো: আল-মামুন :

বাংলাদেশের কৃষি আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তন ফসল উৎপাদনে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে চাষযোগ্য জমির ওপর বেড়েছে চাপ। এই বাস্তবতায় কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন বিকল্প ফসল, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং এমন কিছু উদ্ভাবনী উপাদান, যা ভবিষ্যতের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। দীর্ঘদিন অবহেলিত সবজি মেস্তা বা রোজেলা তাই সামনে এসেছে নতুন সম্ভাবনার ফসল হিসেবে। লাল ক্যালিক্স, ভিটামিনসমৃদ্ধ পাতা এবং প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ব্যবহারযোগ্যতার কারণে এটি এখন কৃষক থেকে উদ্যোক্তা-সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।
বিশ্বের বহু দেশেই রোজেলা বহুল ব্যবহৃত। আফ্রিকা, সুদান ও মিসর থেকে ব্রাজিল, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া পর্যন্ত নানা দেশে রোজেলা থেকে তৈরি চা, জেলি, ক্যান্ডি বা পাউডার ব্যাপক জনপ্রিয়। বাংলাদেশেও ফসলটির পরিচিতি বিস্তৃত, তবে অঞ্চলভেদে এর নাম এত ভিন্ন যে চাষাবাদে কখনো বিভ্রান্তি তৈরি হয়। রাজশাহীতে চুকাই, খুলনা-সাতক্ষীরায় অম্লমধু, সিলেটে হইলফা, কুমিল্লায় মেডশ -এ যেন স্থানীয়তার বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এক রঙিন ভুবন। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যেও রোজেলার আলাদা পরিচিতি রয়েছে। এই বৈচিত্র্য শুধু নামেই নয়; বরং ফসলটির সামাজিক বিস্তার ও দীর্ঘদিনের গ্রামীণ ইতিহাসের কথাও তুলে ধরে।

বাংলাদেশের মাঠে রোজেলা চাষ এখনো সীমিত পরিসরে। অসংখ্য কৃষক জানতেই পারেন না, তাদের জমিতে যে লাল ক্যালিক্স ফুটে থাকে, তা কেবল একটি টক স্বাদের অপরিচিত ফল নয়; আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদাসম্পন্ন উচ্চমূল্যের একটি পণ্য। যে কৃষক গতকাল পর্যন্ত একে গুরুত্বহীন ভাবতেন, যথাযথ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও বাজারসংযোগ পেলে তিনিই হয়ে উঠতে পারেন নতুন উদ্যোক্তা। রোজেলা উপেক্ষিত সম্ভাবনার জাগরণ, কৃষির বহুমুখীকরণের অনিবার্য অঙ্গ এবং নীতি-নির্ধারকদের দ্রুত মনোযোগ দাবি করা বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। রোজেলার সবচেয়ে বড় শক্তি তার বহুমুখিতা। একটি গাছ থেকেই পাওয়া যায় পুষ্টিসমৃদ্ধ পাতা, ক্যালিক্স, বীজ ও প্রাকৃতিক রঙ। পাতাকে সবজি হিসেবে খাওয়া যায়, আর ক্যালিক্স দিয়ে তৈরি হয় বিশ্বখ্যাত রোজেলা চা, যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যন্থোসায়ানিনসমৃদ্ধ হওয়ায় উচ্চ রক্তচাপ ও খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে ভূমিকা রাখে। ডায়েট-সচেতন মানুষের কাছে এটি দ্রুতই জনপ্রিয় হয়েছে। শিল্পখাতেও রোজেলার ব্যবহার বিস্তৃত; বিশেষ করে পানীয়, বেকারি, শিশুখাদ্য, প্রসাধনী এবং বস্ত্রশিল্পে এর প্রাকৃতিক রঙের গুরুত্ব বাড়ছে। স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্যসচেতনতার যুগে হারবাল কসমেটিকসে রোজেলা ভিত্তিক পণ্যের চাহিদা বাড়ায় ফসলটির শিল্পমূল্য আরও স্পষ্ট হচ্ছে।

বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক এখনও এক-দুই ধরনের প্রধান ফসলে নির্ভরশীল। ফলে বাজারদর কমে গেলেই তাদের জীবিকা টলে যায়। এই প্রথাগত কাঠামো ভেঙে নতুন আয়ের দরজা খুলে দিতে পারে রোজেলা- বহুমুখী, কম খরচে চাষযোগ্য এক সম্ভাবনাময় ফসল। অল্প জমিতেই রোজেলা চাষ লাভজনক। কয়েকটি গাছ থেকেই যে পরিমাণ ক্যালিক্স পাওয়া যায়, তা প্রক্রিয়াজাত করে চা, পাউডার, জেলি বা আচার বানালে কৃষকের আয় কয়েকগুণ বাড়তে পারে। শুধু ক্যালিক্স নয়, তাজা রোজেলা পাতা স্থানীয় বাজারে প্রতিদিন বিক্রি করে বাড়তি আয় করাও সম্ভব। আর এসব প্রক্রিয়াজাতকরণে গ্রামের নারীদের জন্য তৈরি হতে পারে ছোট উদ্যোগ -শুকনো পাতা, চা ব্যাগ, আচার বা জেলি তৈরির মতো সহজ কিন্তু লাভজনক কার্যক্রম।

দেশে রোজেলা চাষে গবেষণার অগ্রগতি থাকলেও তা মাঠে পৌঁছতে পারেনি যথাযথভাবে। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত বিজেআরআই মেস্তা-২ ও বিজেআরআই মেস্তা-৪ জাত দুটি কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। প্রথমটি উচ্চ ফলনশীল ও স্বাদে সমৃদ্ধ, আর দ্বিতীয়টি খরা সহনশীল, নেমাটোড প্রতিরোধী এবং অনুর্বর জমিতেও ভালো বেড়ে ওঠে। কিন্তু কৃষকের জানাশোনা কম, বাজারসংযোগ দুর্বল এবং সরকারি অগ্রাধিকারের অভাবের কারণে উন্নত জাতের সুবিধা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে না। ফলে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে পিছিয়ে আছে, যেখানে সুদান বা থাইল্যান্ড রোজেলা রপ্তানিতে কোটি ডলারের বাজার দখল করে ফেলেছে। রোজেলা চায়ের আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য নির্ধারিত হয় ক্যালিক্স শুকানোর মানের ওপর।

বাংলাদেশে সাধারণ রোদে শুকিয়ে নিম্নমানের পণ্য তৈরি করা সম্ভব হলেও রপ্তানিযোগ্য মানে পৌঁছাতে প্রয়োজন হাইজিন নিয়ন্ত্রিত ড্রায়ার, মানসম্মত প্যাকেজিং ও স্ট্যান্ডার্ডাইজড প্রক্রিয়াজাত প্রযুক্তি। থাইল্যান্ড বা সুদানে এই ধরনের ছোট ছোট ইউনিট এখন ব্যাপকভাবে গড়ে উঠেছে। অথচ বাংলাদেশে এর প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি কৃষকদের উৎপাদনকে স্থানীয় বাজারে আটকে রেখেছে। একটি সম্ভাবনাময় ফসল শুধুই প্রযুক্তিগত ঘাটতি ও নীতিগত অবহেলার কারণে এখনো অনুন্নত অবস্থায় পড়ে আছে-এটাই রোজেলার বাস্তবতা। রোজেলা নিয়ে বিশ্ববাজারের সাফল্য আমাদের জন্য বড় শিক্ষা। আফ্রিকান নারীর ছোট বাগানের রোজেলা আজ আন্তর্জাতিক খাদ্য ও পানীয় শিল্পের কাঁচামাল। সুদানের ‘কারকাদে’ চা তাদের জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। থাইল্যান্ডে রোজেলাকে “সুপারফুড” হিসেবে পরিচিত করে একটি শক্তিশালী ভ্যালু চেইন গড়ে তোলা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে এখনও রোজেলার জন্য নেই কোনো জাতীয় নীতি, নেই কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বা ব্যাপক সরকারি প্রকল্প। কৃষি সম্প্রসারণেও ফসলটি তেমনভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে চাষাবাদ সীমাবদ্ধ হয়ে আছে কিছু বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে, আর কৃষকেরাই নিজের উদ্যোগে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ছবিটা বদলানো সম্ভব। রোজেলাকে উদীয়মান ফসল হিসেবে কৃষিনীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় জায়গা দিতে হবে। বিজেআরআই, বিসিএসআইআর ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ে নতুন জাত, রোগপ্রতিরোধক্ষমতা, ক্যালিক্সের রঙ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মাত্রা নিয়ে গবেষণায় গতি আনা যেতে পারে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মাঠ পর্যায়ে প্রদর্শনী প্লট ও প্রশিক্ষণ চালু করলে কৃষকেরা সহজে শিখতে পারবেন। পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে ছোট প্রক্রিয়াজাত ইউনিট-ড্রায়ার, প্যাকেজিং বা চা-জেলি তৈরির সরঞ্জাম স্থাপন করা গেলে স্থানীয় যুব ও নারী উদ্যোক্তারা দ্রুত যুক্ত হতে পারবেন। আন্তর্জাতিক মান ও ব্র্যান্ডিং নিশ্চিত করা গেলে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকার বাজারেও “বাংলা রোজেলা” দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
সমীক্ষা বলছে, স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি, চিনি মুক্ত পানীয়ের জনপ্রিয়তা এবং প্রাকৃতিক পণ্যের প্রতি বৈশ্বিক ঝোঁক রোজেলার বাজারকে দ্রুত বিস্তৃত করছে। এ বাজারে বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবেই সুবিধাজনক অবস্থানে, আমাদের জলবায়ু ও মাটি রোজেলা চাষের জন্য আদর্শ। স্বল্প পুঁজিতে ঘরের পাশেই রোজেলা চাষ, ক্যালিক্স শুকানো বা পণ্য প্রস্তুতের সুযোগ নারীদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে স্পষ্ট সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। প্রয়োজন শুধু যথাযথ প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি এবং বাজারসংযোগ। এগুলো নিশ্চিত করতে পারলে রোজেলা বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন, বাজারের অস্থিরতা, উৎপাদন ব্যয়ের বৃদ্ধি – সব মিলিয়ে কৃষক আজ ঝুঁকির ভেতরে। এমন পরিস্থিতিতে রোজেলার মতো বহুমুখী, উচ্চমূল্যের, জলবায়ু সহনশীল এবং প্রক্রিয়াজাতভিত্তিক ফসলই কৃষিকে নতুন পথ দেখাতে পারে। রোজেলার সম্ভাবনা কৃষকের আয়ের গণ্ডি পেরিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, সুস্বাস্থ্য সচেতনতা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং কৃষির বহুমুখীকরণে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। রোজেলার গল্প তাই উপেক্ষিত সম্ভাবনার -যা সঠিক পরিকল্পনা, গবেষণা ও বাজার ব্যবস্থার সহায়তা পেলে দেশের কৃষি অর্থনীতিকে নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে পারে।
লেখক: প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, মানিক মিয়া এভিনিউ, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *