পুলিশও মানুষ, তাদের কষ্ট বোঝার চেষ্টা করুন

অন্যান্য সারাদেশ
Spread the love

মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ :

দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যাঁরা দিন-রাত নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, তাঁদের অন্যতম হলো বাংলাদেশ পুলিশ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সমাজের এক শ্রেণির মানুষ প্রায়ই কথায় কথায় পুলিশকে সমালোচনার নিশানায় টেনে আনেন—তির্যক মন্তব্যে, কটাক্ষে। যেন পুলিশ মানেই ভুলের প্রতীক, অন্যায়ের প্রতিনিধি। অথচ একবারও কি আমরা ভেবে দেখি, যারা প্রতিদিন আমাদের নিরাপত্তার জন্য জীবন বাজি রেখে কাজ করেন, তাঁদের মানবিক দিকটা কেমন? তাঁদের পরিবার, উৎসব, বিশ্রাম—সবকিছুই যেন দায়িত্বের ভারে হারিয়ে যায়।

আমরা সরকারি সুবিধা ভোগ করি—বাসাভাড়া ভাতা, রেশন, টিএ-ডিএ ইত্যাদি। কিন্তু পুলিশ সদস্যরা একই সুবিধা পেলে শুরু হয় সমালোচনার ঝড়। কেন এই বৈষম্য? তাঁরা কি আমাদের চেয়ে আলাদা? না, তারাও সরকারি কর্মচারী, নাগরিক, আর সবার মতো মানুষ। একটু গভীরে তাকালে দেখা যায়, পুলিশের জীবন অন্য যেকোনো পেশাজীবীর চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ও নিয়ন্ত্রিত। একজন কনস্টেবল থেকে শুরু করে একজন এসআই বা ইন্সপেক্টর—প্রত্যেকেই ২৪ ঘণ্টা দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। তাঁদের কোনো নির্দিষ্ট অফিস টাইম নেই। দিনের পর দিন ডিউটি, রাতে টানা নাইট শিফট—এ যেন এক অদৃশ্য যন্ত্রের মতো জীবন। আপনি কি জানেন, একজন পুলিশ সদস্য প্রতি মাসে অন্তত ১০ থেকে ১৫ দিন রাত ৮টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত নাইট ডিউটি করেন? দিনে বিশ্রাম নেই—কারণ তখনও নতুন দায়িত্বের ডাক পড়ে। পরিবার থেকে দূরে, এক জেলা থেকে আরেক জেলায়, অপরিচিত পরিবেশে থেকেও তাঁরা কর্তব্যে অবিচল। অনেকে বছরের পর বছর নিজের গ্রামের মাটিতে পা রাখতেও পারেন না।

উৎসবের দিনেও দায়িত্ব
ঈদ, পূজা, নববর্ষ—আমাদের কাছে আনন্দের দিন, কিন্তু তাঁদের কাছে দায়িত্বের দিন। আমরা যখন পরিবারের সঙ্গে ঈদের নামাজ পড়ি, আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াই, তখন পুলিশ সদস্যরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। তাঁদের সন্তানরা হয়তো বাবার জন্য অপেক্ষা করে থাকে, কিন্তু তিনি ফিরতে পারেন না—দেশের দায়িত্ব তাঁকে ডাকছে। অধিকাংশ সরকারি কর্মচারী নিজ জেলা বা বাড়ির কাছেই চাকরি করেন, কিন্তু পুলিশের ট্রান্সফার মানেই নতুন জেলা, নতুন পরিবেশ, নতুন দায়িত্ব। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে বছরের পর বছর তাঁরা কাজ করেন—অভিযোগ ছাড়াই, নীরবে, নিষ্ঠার সঙ্গে। রোদ, বৃষ্টি, ঝড়—সবকিছু উপেক্ষা করে তাঁরা থাকেন মাঠে; কখনও রাজনৈতিক সমাবেশ, কখনও ধর্মীয় অনুষ্ঠান, কখনও অভিযান—সবক্ষেত্রেই সামনের সারিতে।

দোষ কার?
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমরা প্রায়ই ভুলে যাই—পুলিশকে কর্তৃপক্ষের আদেশ ও নির্দেশ পালন করতে হয়। এই নির্দেশ বাস্তবায়নের সময়ই তারা অনেক সময় জনরোষের মুখে পড়ে। কেউ গালাগাল করে, কেউ ভিন্ন চোখে দেখে। কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছি—তাঁরা নিজের ইচ্ছায় নয়, চাকরি ও শৃঙ্খলার স্বার্থে দায়িত্ব পালন করছেন? রাষ্ট্রযন্ত্র যেমনভাবে নির্দেশ দেয়, পুলিশ তেমনভাবেই কাজ করে। তাতে পুলিশের কী দোষ? মাঠে কাজ করে বলে তাদেরই চোখে পড়ে, অথচ যারা আদেশ দেয়, তারা থাকে পর্দার আড়ালে।

সমাজে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশ সবসময়ই নানাভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—যার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ হয়, তার আত্মীয়-স্বজন কখনোই পুলিশকে ইতিবাচকভাবে দেখে না। ক্ষমতাসীন দলের নির্দেশে কাজ করতে গিয়ে পুলিশকে বিরোধী দলের প্রতিবাদ বা সমালোচনার মুখে পড়তে হয়, যা পুলিশের এক ধরনের পেশাগত বাস্তবতা।
আজ পর্যন্ত কি কেউ দেখেছেন, পুলিশ সরকারি আদেশ ছাড়া অন্য কিছু করেছে বা সরকারের বিপক্ষে কাজ করেছে? নিশ্চয়ই না।

হ্যাঁ, কিছু ‘অতিউৎসাহী’ সদস্য কখনও নীতি-নৈতিকতার বাইরে গিয়ে কাজ করে বাহিনীর বদনাম ডেকে আনে—কিন্তু তাঁদেরও শাস্তি হয়, তদন্ত হয়, দায়িত্ব নির্ধারণ হয়। একক কোনো ভুলের দায়ে পুরো বাহিনীকে দোষারোপ করা ন্যায়সঙ্গত নয়।

সমাজের সহমর্মিতা প্রয়োজন
বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা প্রতিদিন সন্ত্রাস, অপরাধ, দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এমনকি রাজনৈতিক সহিংসতার মতো নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেন। কেউ আহত হন, কেউ প্রাণ হারান—তবুও তাঁরা দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান না। তাঁদের এই ত্যাগ কি আমরা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেছি?
তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, পুলিশের ভালো কাজ সমাজে তেমন প্রচার পায় না বরং কোনো নেতিবাচক খবর এলেই তা ভাইরাল হয়। অথচ নীরবে-নিভৃতে দেশের আইন, নিরাপত্তা ও মানবিক দায়িত্ব রক্ষায় পুলিশের ভূমিকা অপরিসীম।
আমরা জানি কি— বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রথম রাইফেল উঁচু করেছিলেন বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর রাজার বাগ পুলিশ লাইনের সদস্যরা।স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মদানকারী পুলিশ সদস্যদের অবদান ও মূল্যায়ন নিয়ে এই বাহিনীর মধ্যে রয়েছে চাপাক্ষোভ। উদাহরণ স্বরুপ বলাযায়, বাংলাদেশ পুলিশের সদস্য পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার বাদুরা গ্রামের মৃত আবুল হোসেন শরীফ এর পূত্র মোঃ শাহআলম শরীফ (কং নং–৩২২) ১৯৭১সালের ৭ ডিসেম্বর পটুয়াখালী কর্তব্যরত অবস্হায় পাকিস্তানি সেনাদের মুখোমুখি যুদ্ধে শহীদ হন।তার লাশটি পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।তার স্বজনের জন্য বা তার স্মৃতি রক্ষার্থে রাষ্ট্র কোন ব্যবস্হা নেয়নি।দেশ এ রকম শাহআলমদের খবর নেয় না,স্মৃতির গভীরে হারিয়ে যায় শাহআলমরা।কিন্তু দেশের কাছে আত্মত্যাগের যে প্রশ্ন রেখে যায় তা হারায় না।

আমরা নাগরিকরা প্রায়ই পুলিশের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করি, কিন্তু বিপদে পড়লে প্রথমেই যাঁদের খুঁজি, তাঁরা পুলিশই। তাঁদের উপস্থিতি মানেই নিরাপত্তার অনুভূতি।
পুলিশের কষ্ট ও মানবিক দিকগুলো সমাজে খুব কমই প্রচার পায়। খুন, দুর্ঘটনা,অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলোও তারা নিরলসভাবে করে যায়। অজানা হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন থেকে শুরু করে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের উদ্ধার ও আত্মীয়দের খবর দেওয়া পর্যন্ত—প্রতিটি ধাপে পুলিশ এগিয়ে থাকে। তাই সময় এসেছে, পুলিশকে শুধু সমালোচনার নয়, সহানুভূতির চোখে দেখার।

আমরা চাই মানবিক পুলিশ প্রশাসন, কিন্তু সেই মানবিকতার প্রতিফলন ঘটাতে হলে সমাজকেও মানবিক হতে হবে। তাঁদের কাজের মূল্যায়ন করতে হবে, তাঁদের কষ্ট বোঝার চেষ্টা করতে হবে। চলুন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার পরিবেশ তৈরি করি। পুলিশ ও জনগণ—দু’জনেই রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একে অপরের পাশে দাঁড়ানোই হোক আমাদের অভ্যাস। তাহলেই গড়ে উঠবে মানবিক, নিরাপদ ও সহানুভূতিশীল বাংলাদেশ।
লেখক : শিক্ষক ও সাংবাদিক, সাধারণ সম্পাদক, মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাব, পিরোজপুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *