ইয়াহিয়া খান রিজন :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট শেষ হওয়ার পর ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা। বেসরকারি ফলাফল বলছে, দীর্ঘ ২০ বছর পর আবারও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পথে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তাদের নেতৃত্বাধীন জোট। বেসরকারিভাবে ঘোষিত ২৯৯টি আসনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১৩টি আসনে জয়লাভ করেছে। এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপী) ১টি, গণ সংহতি আন্দোলন ১টি, গন অধিকার পরিষদ ১টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ ২টি, খেলাফত মজলিশ ১টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয়েছেন ৭টি আসনে জয়লাভ করেছে।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) রাতে ভোট গণনা শেষে বিভিন্ন আসনের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পথ সুগম হয়েছে। ফলে সংসদের প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় দেখা যেতে পারে জামায়াতে ইসলামকে। সেই সঙ্গে সংসদে এবার নতুন মুখের তরুণ নেতৃত্ব দেখা যাবে। যারা সংসদকে প্রাণবন্ত ও সরব রাখার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
শেরপুর-৩ (ঝিনাইগাতী-শ্রীবরদী) আসনের নির্বাচন স্থগিত থাকায় এবার ২৯৯ আসনে মোট ২ হাজার ২৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন, স্বতন্ত্র ২৭৪ জন এবং নারী প্রার্থী ৮৩ জন। নারী প্রার্থীদের মধ্যে দলীয় ৬৩ এবং স্বতন্ত্র ২০ জন।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন। দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয় সকাল সাড়ে ৭টায়। মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন ভোটার ২৯৯টি আসনে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন। এছাড়া ১২৪টি দেশে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়েছিল।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম সাড়ে সাত ঘণ্টায় ভোট পড়েছে প্রায় ৪৮ শতাংশ। কয়েকটি আসনে ভোটের হার ৭০ শতাংশেরও বেশি। শুরুতে ভোটারদের উপস্থিতি কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের ব্যাপক ভিড় লক্ষ্য করা যায়। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় পর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার এমন স্পষ্ট দ্বিমুখী রূপ ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুস বিজয়ী হওয়ায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নতুন সরকারের নেতৃত্ব দিতে পারেন। নির্বাচনে তারেক রহমান ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ দুই আসনেই বেসরকারি ফলে জয়ী হয়েছেন। এতে করে প্রায় ৩৫ বছর পর আবারও একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
৩৫ বছরের রেকর্ড ভাঙছেন তারেক রহমান : সর্বশেষ ১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কাজী জাফর আহমেদ। ১৯৯০ সালের পর থেকে দেশে আর কোনো পুরুষ প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেননি। ১৯৯০ সালের পর থেকে দীর্ঘ ৩৫ বছর বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসনখালেদা জিয়া এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তারেক রহমানের এই বিজয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় পর দেশের শীর্ষ নির্বাহী পদে কোনো পুরুষ নেতা আসীন হচ্ছেন।
সর্বশেষ ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩টি আসনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছিল। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতির কাছে ইস্তফাপত্র প্রদানের মাধ্যমে সেই মেয়াদের সমাপ্তি ঘটে। এর আগে দীর্ঘ ৯ বছর স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে নেতৃত্ব দিয়ে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বেগম খালেদা জিয়া। এছাড়া ১৯৯৬ সালেও স্বল্প সময়ের জন্য সরকার গঠন করেছিল বিএনপি। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার পর এবার আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
নির্বাসন থেকে রাজসিক ফেরা : ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কারাবন্দি অবস্থায় নির্যাতিত হওয়ার পর চিকিৎসার জন্য লন্ডন পাড়ি দিয়েছিলেন তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৬ বছর পর গত ২৫ ডিসেম্বর যখন তিনি ঢাকা বিমানবন্দরে নামেন, তখন হাজার হাজার নেতাকর্মীর আবেগঘন উপস্থিতি তাকে বরণ করে নেয়। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যেদিন থেকে দেশে নেমেছি, সময় কীভাবে কাটছে বুঝতেই পারছি না।
ব্যক্তিগত শোক ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার : তারেক রহমানের এই বিজয় এসেছে এক গভীর ব্যক্তিগত শোকের মধ্য দিয়ে। গত ৩০ ডিসেম্বর তার মা এবং বিএনপির দীর্ঘদিনের কাণ্ডারি বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন। দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় মাকে হারানো তারেক রহমান এখন তার বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও মা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
২০০৮ সালের পর দীর্ঘ সময় ধরে দেশে ক্ষমতার প্রকৃত পালাবদল হয়নি- এমন অভিযোগ রাজনৈতিক মহলে ছিল। ফলে জবাবদিহি, অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সেই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি গণতন্ত্রে উত্তরণের একটি বড় ধাপ, তবে পথ এখনো সহজ নয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সামনে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বিজয়ী দলকে। নতুন সরকারকে সামনে রেখে কয়েকটি বড় প্রশ্ন উঠে আসছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, রাজনৈতিক সহনশীলতা ও বিরোধী দলের প্রতি আচরণ কেমন হবে, নির্বাচনোত্তর অভিযোগ ও অসন্তোষ কীভাবে সমাধান করা হবে, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে কী উদ্যোগ নেওয়া হবে আর সর্বশেষ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা কতটা নিশ্চিত করা হবে।
অন্যদিকে, মূল ধারার গণমাধ্যমের অনুকূল সমর্থন পেয়েছে বিএনপি। প্রতিক্রিয়াশীল আর চরমপন্থিদের হামলার শিকার হয়েছে বড় বড় গণমাধ্যম। ফলে সেসব গণমাধ্যম বিএনপির ন্যারেটিভ বির্নিমাণে ও ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে মিত্রভূমিকা পালন করেছে। তবে আগামীতে এই ধরনের মিত্রভূমিকার বদলে বৈরিতা দেখা দিতে পারে।
দিনশেষে এটাই স্পষ্ট যে, ত্রয়োদশ সংসদে ক্ষমতার সমীকরণ বদলাতে যাচ্ছে। ভোটাররা তাদের মত প্রকাশ করেছেন। এখন দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের, এই ফলকে কি তারা অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের ভিত্তিতে রূপ দেবেন, নাকি নতুন করে আরেক অধ্যায়ের সূচনা হবে, সেটিই দেখার বিষয়।