ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আজ

জাতীয় প্রচ্ছদ রাজনীতি
Spread the love

রেজাউল করিম ভূঁইয়া :

অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার এবং সংশয়ের অবসান ঘটতে যাচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার ১২ ফেব্রুয়ারি । শেষ হচ্ছে ভোট নিয়ে নানা উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার। ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও কৌতূহলের সমাপ্তির ইতি টেনে আজ সকাল সাড়ে সাতটা থেকে শুরু হয়েছে বহুল কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ। একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হচ্ছে গণভোট। ভোট গ্রহণ চলবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। নির্বাচনে দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৯টি আসনে ৪২ হাজার ৬৫১টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ করা হবে। বাকি একটি আসন শেরপুর-৩-এ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুতে ওই আসনে নির্বাচন স্থগিত করেছে ইসি। আসনটির ভোটকেন্দ্র ১২৮টি। ফলে ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হচ্ছে ২৯৯ আসনে। অপরদিকে সংসদ নির্বাচন ঘিরে বাড়তি সতর্কতা ও নজরদারি বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা। তারপরও ভোট গ্রহণের দিন বা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কেউ কেউ সংঘাত-সহিংসতার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

এবারে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণের সময় একই সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় ভোট দেওয়ার সময় অন্যবারের চেয়ে এক ঘণ্টা বাড়িয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে বিশেষ এক পরিস্থিতির মধ্যে এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তাই বাড়তি নজর বা কৌতূহল রয়েছে সবখানে। সারা বিশ্ব নজর রাখছে বাংলাদেশের নির্বাচনের দিকে। ফলে সুষ্ঠু-সুন্দর, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক ভোট বা নির্বাচন সম্পন্ন করার বিষয়ে বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিবন্ধিত ৬০টি দলের মধ্যে অংশ নিচ্ছে ৫১টি রাজনৈতিক দল। মোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা দুই হাজার ২৮। সংসদীয় আসনগুলোতে ভোটের মাঠে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে দলীয় প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে নারী ৮৩ জন। এর মধ্যে দলীয় ৬৩ জন এবং স্বতন্ত্র ২০ জন। বিএনপির নারী প্রার্থী ১০ জন। তবে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য ইসলামী দলগুলোর নারী প্রার্থী নেই। নির্বাচনে মোট প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ৪ শতাংশ।
এবারের নির্বাচনে মাঠে প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। এর বাইরেও জাতীয় পার্টিসহ আরও কয়েকটি দল এককভাবে ভোটে অংশ নিয়েছে। তবে এবার ভোটের মাঠে নেই দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর টানা শাসন করা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। অন্তর্বর্তী সরকার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় নির্বাচনের বাইরে রয়েছে দলটি।
ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বী যেসব দল বা জোট : বিএনপির নেতৃত্বাধীন দল ও জোট চ্যালেঞ্জ ছুড়েছে জামায়াত জোটের বিরুদ্ধে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন দল বা জোটগুলো হলো বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণঅধিকার পরিষদ, গণফোরাম, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম), গণতন্ত্র মঞ্চের নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, ভাসানী জনশক্তি পার্টি, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) নেতৃত্বাধীন ১২-দলীয় জোট, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের ১১টি দল ও গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য। তবে শেষ মুহূর্তে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামও যুক্ত হয়েছে এই জোটে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মোট ১১টি দল নিয়ে জোটবদ্ধভাবে ভোটে অংশগ্রহণ করছে। দলগুলো হচ্ছে জুলাই অভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), লিবারেল ডেমোক্রের্টিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ লেবার পার্টি।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের তথ্য অনুসারে, ২৯৯টি আসনের মধ্যে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী রয়েছেন ২৯০ জন। অন্য ৯টি আসনে নিজস্ব প্রতীক নিয়ে লড়ছেন বিএনপি জোটের প্রার্থীরা। অন্যদিকে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীক রয়েছে ২২৮টি আসনে। এর মধ্যে সাতটি আসন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থীদের ছেড়ে দিয়ে ওই আসনগুলো থেকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক প্রত্যাহার চেয়ে নির্বাচন কমিশনে আবেদন করে জামায়াত। কিন্তু কমিশন জানায়, প্রত্যাহারের সময় পার হয়ে যাওয়ায় ওই আসনগুলোতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক থাকবে।

এবারের নির্বাচনে ভোটের জন্য উন্মুখ দেশের মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন ভোটার তাদের ভোট প্রদান করবেন। এর মধ্যে নারী ভোটার ছয় কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং পুরুষ ছয় কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন। আর তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার এক হাজার ২৩২ জন। এর মধ্যে শেরপুর-৩ আসনের চার লাখ ১৩ হাজার ৩৩৭ জন ভোটারকে ভোট দেওয়ার জন্য আরো কিছুদিন অপেক্ষায় থাকতে হবে। এ আসনে মোট ভোটার চার লাখ ১৩ হাজার ৩৩৭ জন। এর মধ্যে নারী দুই লাখ আট হাজার ৩০৪ জন, পুরুষ দুই লাখ পাঁচ হাজার ৬৬ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার সাতজন। ফলে আজ ভোট দিতে পারবেন ১২ কোটি ৭২ লাখ ৯৮ হাজার ৪৫৬ জন ভোটার।
সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সারা দেশে মোট ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে ২ লাখ ৪৫ হাজারেরও বেশি ভোটকক্ষ তৈরি করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকার শীর্ষে রয়েছে ঢাকা। তবে ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে সিসিটিভি নজরদারি নিশ্চিত করা হয়েছে বলে ইসি জানিয়েছে। ভোট গ্রহণে রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ৫৯৮ জন। ৬৪ জন জেলা প্রশাসক ছাড়াও দুজন বিভাগীয় কমিশনার এবং তিনজন আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন মোট সাত লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন।

সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় প্রস্তুত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী : নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠে সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীর ৯ লাখ ১৯ হাজার ২৮০ জন সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর এক লাখ তিন হাজার, উপকূলীয় পাঁচটি জেলার ১৭টি আসনে নৌবাহিনীর পাঁচ হাজার, বিমানবাহিনীর সাড়ে তিন হাজার, বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩, ১০টি জেলার ১৭টি আসনে কোস্ট গার্ডের তিন হাজার ৫৮৫, পুলিশ এক লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩, র‌্যাবের ৯ হাজার ৩৪৯, আনসার পাঁচ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ এবং বিএনসিসির এক হাজার ৯২২ জন সদস্য নির্বাচনী নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে গত রবিবার থেকে তারা সারা দেশে দুই পর্বে সাত দিনের (ভোটের আগে পরে) জন্য বিশেষ দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন। এই সময়ে ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ মাঠে দায়িত্ব পালন করছেন বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া এবার প্রথমবারের মতো নির্বাচনে ড্রোন, বডি-ওর্ন ক্যামেরা এবং ব্যাপকভাবে সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী, এবার নির্বাচনে সারা দেশে (মহানগর এলাকার বাইরে) প্রতিটি সাধারণ ভোটকেন্দ্রে ১৬ থেকে ১৭ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭ থেকে ১৮ জন নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন থাকবেন। এ ছাড়া মহানগর এলাকার সাধারণ ভোটকেন্দ্রে ১৬ জন ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭ জন মোতায়েন থাকবেন। দুর্গম হিসেবে চিহ্নিত ২৫ জেলার নির্দিষ্ট এলাকার ভোটকেন্দ্রে মোতায়েন থাকবেন ১৬ থেকে ১৮ জন করে সদস্য। পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘এবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৯০ শতাংশ কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। এ ছাড়া পুলিশ সুপাররা ড্রোন ব্যবহার করবেন।’

অতীতে দলীয় সরকারের অধীনে তিনটি চরম বিতর্কিত নির্বাচনের পর এবারের নির্বাচনের অন্যতম বৈশিষ্ট হলো এটি নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রবাসী, দেশের অভ্যন্তরে নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কারাগারে থাকা ভোটাররাও ভোট দিচ্ছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস একাধিকবার এবার ইতিহাসের সেরা নির্বাচন হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন। গত বুধবার তিনি জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে বলেছেন, এবারের নির্বাচন শুধু আরেকটি নিয়মিত নির্বাচন নয়। এটি একটি গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, বৈষম্য, বঞ্চনা ও অবিচারের বিরুদ্ধে জনগণের যে জাগরণ আমরা দেখেছি, এই নির্বাচন তার সাংবিধানিক প্রকাশ। রাজপথের সেই দাবি আজ আপনাদের ব্যালটের মাধ্যমে উচ্চারিত হতে যাচ্ছে। তাই এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। তবে বিশেষজ্ঞদের কারো কারো মতে, দেশের বর্তমান রাজনীতিতে অস্ত্র, পেশিশক্তি, ধর্ম, পুরুষতান্ত্রিকতা ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রভাব প্রবল হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা তাদের ভোটাধিকার সঠিকভাবে চর্চা করতে পারবে কি না, তা নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত সোমবার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আইন-শৃঙ্খলা মনিটরিং সেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।

ভোট গণনা ও ফলাফল : নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দুটি ব্যালট একই সঙ্গে গণনা করা হবে। কেন্দ্র পর্যায়ে প্রাথমিক ফল প্রকাশের পর তা রিটার্নিং অফিসারের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হবে। বেশির ভাগ আসনের ফলাফল মধ্যরাতের মধ্যেই পাওয়া যাবে বলে আশা করছে কমিশন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *