নতুন সংসদ-সদস্য ও মন্ত্রিসভার শপথ কাল

জাতীয় প্রচ্ছদ
Spread the love

ইয়াহিয়া খান রিজন :

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পড়ানো হবে আগামীকাল (১৭ ফেব্রুয়ারি) মঙ্গলবার। সাধারণত বঙ্গভবনে শপথ অনুষ্ঠান হয়ে থাকলেও এবার তেমনটা হচ্ছে না। এবার প্রধানমন্ত্রীসহ নতুন মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের শপথ জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হবে। তাদের শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। একই দিন সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যরা শপথ নেবেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন সংসদ-সদস্যদের শপথ পড়াবেন।
মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ উপলক্ষ্যে বঙ্গভবন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও সরকারি পরিবহণ পুল সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। নতুন মন্ত্রিসভায় যারা স্থান পাচ্ছেন তাদের শপথ নেওয়ার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ফোন করে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। নির্বাচিত সব সংসদ-সদস্যের ফোন নম্বর নির্বাচন কমিশন থেকে সংগ্রহ করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

জানা গেছে, নির্বাচিত সংসদ-সদস্যরা বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন। নতুন মন্ত্রীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে গাড়ি, বাছাই করা হয়েছে সিকিউরিটি টিম এবং শপথের ফোল্ডার। সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ব্যস্ত সময় পার করছে। নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য, প্রধান বিচারপতি, তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা, সিনিয়র সাংবাদিক, শিক্ষক, আইনজীবীসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, সরকারের সিনিয়র সচিব ও সচিব, বিদেশি রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও মিশনপ্রধান এবং সিনিয়র সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানে প্রায় এক হাজার দেশি-বিদেশি অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হবে।

এদিকে সংসদ সচিবালয় ইতোমধ্যে শপথের অনুষ্ঠান সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খলভাবে আয়োজন নিশ্চিত এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্তটি সফল করতে যাবতীয় কাজ শেষ করে এনেছে। বিশেষ করে প্রটোকল এবং নিরাপত্তা থেকে শুরু করে অতিথি সেবা ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সচিবালয়ের বিভিন্ন দপ্তর ও শাখা যৌথভাবে কাজ করছে। ইতোমধ্যে সংসদ ভবনের ভেতরে ও বাইরে পরিচ্ছন্নতা, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং অবকাঠামোগত প্রস্তুতির কাজ শেষ হয়েছে।
নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে যারা গাড়ি সহায়তা চাইবেন তাদের গাড়ি সরবরাহ করা হবে। তবে শপথ নিয়ে বঙ্গভবন থেকে বের হওয়ার সময় সিকিউরিটি ফোর্স, ফ্ল্যাগসহ গাড়িতে করে বাসায় ফিরবেন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে এখনো নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের নামের তালিকা আসেনি। তবে যে কোনো সময় এই তালিকা পৌঁছে যেতে পারে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। ইতোমধ্যে ৪৫ থেকে ৫০টি গাড়ি, গাড়ির চালক ও গাড়ির ফ্ল্যাগ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে আরও গাড়ি সরবরাহের প্রস্তুতি রয়েছে সরকারি পরিবহণপুলের।

বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ২৯৭ আসনের ফলাফল ঘোষণায় বিএনপি জোট ২১৪ আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। অন্যদিকে তাদের একসময়কার মিত্র জামায়াতে ইসলামী জোট ৭৭ আসন পেয়ে বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ শুক্রবার রাতে নির্বাচিত ২৯৭ জনের গেজেট প্রকাশ করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী সংসদ-সদস্যদের শপথ নেওয়ার মাধ্যমে শুরু হবে নতুন সংসদের যাত্রা। এরপরই দায়িত্ব গ্রহণ করবে নতুন সরকার।

গোপনীয়তার সঙ্গে মন্ত্রিসভার তালিকা করছেন তারেক রহমান: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়েছে বিএনপি। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফলাফলে এখন পর্যন্ত দলটি ২০৯টি আসন পেয়েছে। দুটি আসনের ফল প্রকাশ স্থগিত রয়েছে। একটিতে নির্বাচন হয়নি। ফলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল দীর্ঘ ২ দশক পর দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। এ সরকারের মন্ত্রিসভায় কারা স্থান পাচ্ছেন, সবার নজর এখন সেদিকে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের গেজেট প্রকাশের পর গত কয়েকদিনে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সম্ভাব্য নাম দিয়ে নানা তালিকা প্রকাশিত হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে এ বিষয়ে চলছে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ। এদিকে ৩৫ থেকে ৪০ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন হচ্ছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এসব ধারণানির্ভর বলে জানিয়েছে বিএনপির সংশ্লিষ্ট সূত্র।

মূলত অতি গোপনীতার সঙ্গে মন্ত্রিসভার তালিকা চূড়ান্ত করেছেন তারেক রহমান। সূত্রগুলো বলছে, বিষয়টি নিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান দলের স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ নেতার সঙ্গেও কোনো ধরনের আলাপ করেননি। দু-একজন সিনিয়র নেতার সঙ্গে পরামর্শ করলেও তারা এ ব্যাপারে এককভাবে দলের চেয়ারম্যানকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। ফলে মন্ত্রিসভার তালিকা তারেক রহমান অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে চূড়ান্ত করছেন।
বিএনপির নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানিয়েছে, যেসব তালিকা গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ হচ্ছে, এর অধিকাংশই ধারণানির্ভর। কারণ প্রকৃতপক্ষে শেষ পর্যন্ত কারা মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাচ্ছেন, সে বিষয়টি শুধু জানেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলের নীতিনির্ধারকরা বিষয়টিকে পার্টি চেয়ারম্যানের গুরুত্বপূর্ণ ‘সিক্রেট ফাইল’ বলে অভিহিত করছেন, যা জানার সুযোগ কারও নেই।

সূত্র জানায়, বিএনপির নির্বাচিত এমপিদের মধ্যে অধিকাংশই মন্ত্রী হওয়ার জন্য আগ্রহী। অনেকে নিজেকে মন্ত্রী হওয়ার জন্য যোগ্য মনে করছেন। কেউ কেউ মন্ত্রী হওয়ার জন্য শুরু করেছেন দৌড়ঝাঁপ। কেউ আবার নানা মাধ্যমে লবিং-তদবিরে ব্যস্ত। তবে সরাসরি কেউই তারেক রহমানকে কিছু বলতে সাহস পাচ্ছেন না। এ বিষয়ে কথা বলার সুযোগ নেই বললেই চলে। তারা শুধু সিনিয়রদের কাছে ইনিয়ে-বিনিয়ে নিজের যোগ্যতা এবং অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামে অবদান ও জেল-জুলুম সহ্য করার কথা জানাচ্ছেন। তবে একথা সত্য যে, বিএনপির কিছু সিনিয়র নেতা মন্ত্রী হবেন, সেটি সংগতকারণেই সত্য। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সিরাজগঞ্জ-২ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘মন্ত্রিসভায় কারা আসছেন-এ বিষয়টি আমার জানা নেই। আমাকে এখনো ফোন দেওয়া হয়নি। ফোন দিলে জানাতে পারব।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে তালিকার কথা বলা হচ্ছে-তা অনুমাননির্ভর।’

বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার পদে আলোচনায় যারা : গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জেতার ফলে দেশের শাসনব্যবস্থায় আসছে ব্যাপক পরিবর্তন। জাতীয় সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং সংসদীয় কমিটির সভাপতি নিয়োগ দেওয়া হবে। দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। সেই ধারাবাহিকতায়, বিরোধী দল থেকে একজন ডেপুটি স্পিকার হবেন। এই দৌড়ে আলোচনায় আছেন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মওলানা মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন। একই সঙ্গে এই পদের জন্য দৌড়ে আছেন মীর কাসেম আলির ছেলে ব্যারিস্টার আহমদ বিনকাসেম আরমান। তবে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেনের সম্ভাবনা বেশি।

সূত্রমতে, ১১ দলের শরিকদের মধ্যে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ হতে পারেন বিরোধীদলের হুইপ। জামায়াত নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভাপতি মাওলানা এটিএম মাসুম বলেন, সংসদের এসব পদ নিয়ে দলের এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তাছাড়াও ১১ দলীয় জোট টিকিয়ে রাখার স্বার্থে শরিকদের জন্যও ছাড় দিতে হবে।
এবার নির্বাচিত সংসদকে দুই ধরনের দায়িত্ব পালন করতে হবে। শপথ গ্রহণের পর প্রথম ১৮০ দিন সংসদ-সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবেন। এরপর তারা নিয়মিত আইনপ্রণেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। জুলাই সনদ অনুযায়ী নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনসহ একাধিক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন বা গঠন করা হবে। পাশাপাশি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হবে, যাতে অর্থবিল ও সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব ছাড়া অন্য সব বিলে সংসদ-সদস্যরা দলীয় অবস্থানের বিপক্ষে ভোট দিতে পারেন।

নতুন মন্ত্রীদের জন্য প্রস্তুত গাড়ি ও বাড়ি : নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য ৩৭টি বাড়ি প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। সোমবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে উপদেষ্টা এ তথ্য জানান। এক প্রশ্নে গণপূর্ত উপদেষ্টা বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা ৩৭টি বাড়ি রেডি করে রেখেছি। মিন্টো রোড, হেয়ার রোড, ধানমন্ডি ও গুলশানে এ বাড়িগুলো রয়েছে। প্রয়োজনে আরও কয়েকটি বাড়ি প্রস্তুত করার প্রস্তুতি চলছে। প্রয়োজনে আরও কয়েকটি বাড়ি তৈরি করার প্রস্তুতি চলছে। শপথ নিতে নিতেই এগুলো তৈরি হয়ে যাবে।‘ তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এই সরকার দায়িত্ব নিয়েছিল। ১৮ মাস জনগণের স্বার্থে কাজ করার চেষ্টা করেছি। গত সাড়ে ১৫ বছরের যে ফ্যাসিবাদী শাসন সেটি থেকে দেশকে একটি নতুন গতির মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি। নিজেদের কাজের জন্য জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকার চেষ্টা করেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *