রংপুর সদরে কাদেরসহ তৃতীয় লিঙ্গের রাণীর মনোনয়নপত্র বৈধ

জাতীয় সারাদেশ
Spread the love

রংপুর প্রতিনিধি :

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের, এনসিপি’র সদস্য সচিব আখতার, তৃতীয় লিঙ্গের রাণীসহ রংপুর-৩ (সদর) আসনে যাচাই-বাছাই শেষ দশজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে। রংপুর জেলা প্রশাসক সম্মেলন কক্ষে রিটার্নিং কর্মকর্তা সদর উপজেলা ও সিটি করর্পোরেশন এলাকা নিয়ে গঠিত রংপুর-৩ আসনের দশজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করেন। এতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের, বিএনপি’র সামসুজ্জামান সামু, জামায়াতের মাহবুবার রহমান বেলাল, ইসলামী আন্দোলনের আমিরুজ্জামান পিয়াল, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের আব্দুল কুদ্দুস, স্বতন্ত্র প্রার্থী তৃতীয় লিঙ্গের আনোয়ারা ইসলাম রানী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নুর আলম সিদ্দিকের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। এছাড়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও রাজস্ব বকেয়া থাকায় খেলাফত মজলিসের প্রার্থী তৌহিদুর রহমান মণ্ডল, রাজস্ব বকেয়া থাকায় বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের (মার্কসবাদী) আনোয়ার হোসেন বাবলু এবং মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেয়া সংসদীয় আসনের শতকরা ১ ভাগ ভোটারের তালিকায় গরমিল থাকায় বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য স্বতন্ত্র প্রার্থী রিটার রহমানের মনোনয়পত্র অবৈধ ঘোষণা করা হয়।

অপরদিকে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৩ (সদর) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র বৈধ হওয়া তৃতীয় লিঙ্গের আনোয়ারা ইসলাম রানীর মনোনয়নপত্র বৈধ হওয়ায় তৃতীয় লিঙ্গের মাঝে ব্যাপক আনন্দের তুফান বইছে। আনোয়ারা ইসলাম রানী বলেন, ‘যেখানেই যাচ্ছি মানুষের সাড়া পাচ্ছি। আমাকে সবাই আপন করে নিয়েছেন। রংপুর অবহেলিত অঞ্চল, এই এলাকার নারীরা বিভিন্নভাবে বঞ্চিত। এ কারণে আমি এই আসনে নির্বাচন করে নেতৃত্বে আসতে চাই, জিততে চাই। হামাক ছাওয়া (আমার ছেলে) বলে বারবার সরল মনে যাকেই এই এলাকার মানুষ ভোট দিয়েছে, তারা কেউ উন্নয়ন করেননি, এলাকায় থাকেননি। ফলে আমি আশাবাদী ভোট পাওয়ার বিষয়ে।

স্বতন্ত্র প্রার্থী রাণী বলেন, কোনো ক্ষমতার জোরে বা কোনো দলের ছায়ায় নয়, শুধু মানুষের ভালোবাসা, বিশ্বাস ও ন্যায়ের শক্তিকে সঙ্গী করে আমি রাজনীতি করতে এসেছি। আমি সুবিধাভোগী হতে আসিনি, এসেছি মানুষের কথা বলার জন্য, অবহেলিত কণ্ঠের ভাষা হওয়ার জন্য। তিনি আরো বলেন, আমার কোনো পিছুটান নেই, কোনো সংসার নেই। তাই পুরোটা সময়, শক্তি ও দায়বদ্ধতা আমি উৎসর্গ করতে চাই রংপুর-৩ আসনের মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। সব প্রান্তিক ও পিছিয়ে রাখা জনগোষ্ঠীকে প্রান্তিকতা থেকে মুক্তি দেওয়ার এই সংগ্রাম আমার ব্যক্তিগত নয়। এটি একটি মানবিক দায় ও ন্যায়ের আন্দোলন।

এক প্রশ্নের জবাবে রানী বলেন, ‘আমি স্বভাবিক জীবন পাইনি। অনেক কষ্ট করে বড় হয়েছি। সে কারণে সুবিধাবঞ্চিত সাধারণ মানুষের কষ্ট সবার থেকে ভালো বুঝি। সেই মানসিকতা থেকেই মানুষের কল্যাণে কাজ করছি। সেই উপলব্ধি থেকে রংপুরের উন্নয়ন তথা বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কল্যাণে কাজ করতে চাই। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতায় বা নেতৃত্বে আসার কোনো বিকল্প নেই।
প্রসঙ্গত, আনোয়ারা ইসলাম গত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও রংপুর বিভাগে প্রথমবারের মতো তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। সেবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঈগল প্রতীক নিয়ে তিনি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২৩ হাজার ৩৩৯ ভোট পেয়েছিলেন।

জানা গেছে, রংপুর নগরীর নূরপুর এলাকায় ১৯৯২ সালে জন্ম আনোয়ারা ইসলাম রানীর। পড়াশোনা করেছেন রংপুর টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে। বর্তমানে ন্যায় অধিকার ট্রান্সজেন্ডার উন্নয়ন সংস্থাতেই অন্য সবার সঙ্গে থাকেন রানী। তিনি রংপুরের ন্যায় অধিকার ট্রান্সজেন্ডার উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি। ‘পুরুষ নাকি নারী আমি প্রশ্ন সবার এক, আমি বলি সবার আগে মানুষ হয়ে দেখ’– এই স্লোগান লালন করে দীর্ঘদিন ধরে এই জনগোষ্ঠীর জন্য তিনি কাজ করছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে সংগঠনের পক্ষে সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে প্রশংসিত হয়েছেন তিনি।

রানী শুধু এই নির্বাচনেই নন, বিগত করোনা মহামারীর শুরু থেকে ত্রাণ সাহায্য নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়েছেন। তিনি শুধু হিজড়াদের নয়, সব শ্রেণির মানুষকে সাহায্য করে থাকেন। রংপুর সিটির ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের নূরপুর এলাকার বাসিন্দা রানী। নূরপুর পৌর প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে রংপুর টেকনিক্যাল স্কুল থেকে এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। তিনি ‘রূপান্তর’ নামে একটি হস্তজাত শিল্পের উদ্যোক্তা। সেখানে ২৪ জন হিজড়া কাজ করেন।

উল্লেখ্য, এত দিন সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্রে লিঙ্গ পরিচিতির জায়গায় শুধু ‘মহিলা’ ও ‘পুরুষ’ লিঙ্গের উল্লেখ থাকলেও কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ইসি) দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আইন সংশোধন করে ‘হিজড়া’ পরিচয়ে নির্বাচন করার সুযোগ করে দিয়েছিল। এরপর থেকেই নারী ও পুরুষের পাশাপাশি সংসদ নির্বাচনে ‘হিজড়া’ লিঙ্গ পরিচয়ে নির্বাচনে অংশেনেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *