নিজস্ব প্রতিবেদক :
দীর্ঘদিন বাংলাদেশের রাজনীতিতে আড়ালে থাকা একজন ব্যক্তি ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। কিন্তু তার সাদা দাঁড়ি ও হাস্যোজ্জ্বল মুখসংবলিত বিলবোর্ড ও পোস্টার ঢাকার মোড়ে মোড়ে দেখা যাচ্ছে— যেখানে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে দেশের প্রথম ইসলামপন্থি সরকার গঠনে ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর যে রাজনৈতিক শূন্যতা দেখা দিয়েছিল, সেটির সঠিক ব্যবহার করেছেন ডা. শফিকুর রহমান। তাই ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি হচ্ছেন অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট তাদের সাবেক মিত্র বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিরুদ্ধে আসন্ন নির্বাচনে লড়াই করবে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ প্রথম জাতীয় নির্বাচন এই দুই জোটের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রায় ৯১ শতাংশ মানুষ মুসলমান, বিশ্বের বড় মুসলিম–সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর একটি এটি। দেশটির রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার কথাও বলা আছে। দেশের অধিকাংশ মানুষ সুন্নি মুসলমান।
জানা গেছে, প্রায় ৬৭ বছর বয়সী চিকিৎসক ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান, যিনি এক সময় কেবল কট্টর ইসলামপন্থিদের কাছে পরিচিত ছিলেন, তিনি এখন আগামী জাতীয় নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী পদের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
এক মতামত জরিপে দেখা যাচ্ছে, এক সময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াত, যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল- তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী পারফরমেন্স করতে যাচ্ছে। যা মধ্যপন্থি ও সংখ্যালঘুদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে ইসলামপন্থী গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে কড়াকড়ি অবস্থানে ছিল প্রশাসন। জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের মামলায় কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড হয়। দলটি নিষিদ্ধ হয়ে যায় এবং গোপনে কার্যক্রম চালাতে বাধ্য হয়। শফিকুর রহমানকেও ২০২২ সালে গ্রেপ্তার করা হয়। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের সহায়তার অভিযোগে তাকে ১৫ মাস কারাগারে থাকতে হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান জামায়াত এবং ডা. শফিকুর রহমানের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।
শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পালিয়ে যাওয়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জামায়াতের ওপর থাকা বিধিনিষেধ শিথিল করে। ২০২৫ সালে আদালত দলটির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। ফলে দীর্ঘদিন গোপনে থাকা দলটি আবার প্রকাশ্যে আসে।
এরপর দ্রুত রাজনীতিতে সক্রিয় হয় জামায়াত। তারা দাতব্য ও বন্যা দুর্গতদের জন্য কাজ শুরু করে। এর মধ্যে জামায়াত আমিরের সাদা দাঁড়ি ও সাদা পোশাক তাকে সবার মধ্যে সবচেয়ে দৃশ্যমান করে তোলে।
গত ডিসেম্বরে ডা. শফিকুর রহমান এক সাক্ষাতকারে রয়টার্সকে বলেছিলেন, ‘আমরা (শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে) বারবার কথা বলতে চেয়েছি, কিন্তু আমাদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে। অভ্যুত্থানের পর আমরা আবারও সামনে আসার সুযোগ পেয়েছি।”
চিকিৎসক পরিবার : ১৯৫৮ সালে সিলেটের মৌলভীবাজারে জন্মগ্রহণ করেন ডা. শফিকুর রহমানের। বাম ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরুতে তিনি। এরপর যোগ দেন জামায়াতের ইসলামি ছাত্রশিবিরে। ১৯৮৪ সালে ডা. শফিকুর রহমান জামায়াতে যোগ দেন এবং ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০১৮ সালে সংসদ নির্বাচন করেন। কিন্তু একবারও সফল হননি। ২০২০ সালে হন জামায়াতের আমির। তার স্ত্রী আমিনা বেগম একজন চিকিৎসক এবং ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য ছিলেন। তাদের দুই মেয়ে ও এক ছেলে—তারাও চিকিৎসক। সিলেট অঞ্চলে একটি পারিবারিক হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানও ডা. শফিকুর রহমান।
আরও জানা গেছে, ঢাকার অনেক বাসিন্দারা বলছেন: শেখ হাসিনার শাসনামলে শফিকুর রহমানের পুরো নামই তারা জানতেন না, যা এবারের নির্বাচনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি নেতা তারেক রহমানের থেকে স্পষ্টতই ভিন্ন। তারেক রহমান সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছেলে। নামের শেষে রহমান থাকলেও (তারেক রহমান ও শফিকুর রহমান) দুজনের মধ্যে কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই।
এদিকে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমানকে একজন নম্র ও আন্তরিক ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করে থাকে, যিনি ‘সরলতা এবং সহজলভ্যতার উপর ভিত্তি করে একটি বিনয়ী, সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করেন’।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শফি মোস্তফা বলেছেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পরের মাগুলোতে বাংলাদেশে দৃশ্যমান কোনও নেতা ছিল না। তারেক রহমান লন্ডনে নির্বাসিত ছিলেন। এসময় শফিকুর রহমান পুরো দেশ সফর করেছেন। মিডিয়ার আলোচনায় এসেছেন এবং মাত্র দুই বছরের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী পদের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছেন।’
নির্বাচনি প্রচারণায় ডা. শফিকুরের বক্তব্য অনেক ভোটারের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছে। তিনি জামায়াতকে পরিচ্ছন্ন, ইসলামি মূল্যবোধে অনুপ্রাণিত এক নৈতিক বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। গত ডিসেম্বর মাসে দলটি জেন জি–নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে জোট করে, এতে তরুণ ও তুলনামূলক কম রক্ষণশীল ভোটারদের কাছেও পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
এদিকে বিখ্যাত ইংরেজি টিভি সিরিজ ‘গেম অব থ্রোনসের’ আদলে তৈরি ডা. শফিকুর রহমানের পোস্টার দেশের বিভিন্ন জায়গায় দেখা গেছে। যেগুলোতে ‘দাদু ইজ কামিং’ (দাদু আসছেন)— লেখা দেখা গেছে।
কেউ কেউ ডা. শফিকুর রহমানকে জামায়াতের অধিক মধ্যপন্থি চেহারার হিসেবে দেখেন। তিনি সরকার পরিচালনা, দুর্নীতি-বিরোধী কাজ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ওপর জোর দিয়েছেন। এছাড়া তিনি সব ধর্মের নাগরিকদের জন্য সমান অধিকারের কথা বলেছেন। কিন্তু নারীদের বিষয়ে বিভিন্ন নীতি নিয়ে তিনি আবার সমালোচিতও হয়েছেন। তার দল নির্বাচনে একজন নারীকেও মনোনয়ন দেয়নি। এছাড়া তিনি পরিবারকে বেশি সময় দেওয়ার জন্য নারীদের জন্য পাঁচ কর্মঘণ্টার কথা বলেছেন।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের নিয়ে তার একটি পোস্ট ঘিরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ হয়। তবে জামায়াতের দাবি, ওই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টটি হ্যাক হয়েছিল।
ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘জামায়াত হলো মধ্যপন্থি, আমরা নমনীয়, আমরা যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু আমাদের মূলনীতি কোরআনভিত্তিক, ইসলামভিত্তিক। আর কোরআন শুধুমাত্র মুসলিমদের জন্য নয়। এটি সৃষ্টির সবার জন্য।’