রেজাউল করিম ভূঁইয়া :
দেশের বিপুল কর্মক্ষম যুবসমাজকে দক্ষ করে তুলতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীনে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর বাস্তবায়ন করছে “অ্যাকসেলারেটিং অ্যান্ড স্ট্রেনদেনিং স্কিলস ফর ইকোনমিক ট্রান্সফরমেশন (অ্যাসেট)” প্রকল্প। বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়িত এই প্রকল্প ইতোমধ্যে দেশের কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। লক্ষাধিক যুবক-যুবতী প্রশিক্ষণ পেয়েছেন এবং তাদের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন।
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন Accelerating Skills for Economic Transformation (ASSET) প্রকল্প বাংলাদেশের দারিদ্রতা এবং বেকারত্ব দূরীকরণের জন্য অন্যতম একটি ফ্লাগশিপ প্রকল্প। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হচ্ছে দেশের বেকার যুবক, নারী ও অবহেলিত নৃগোষ্ঠী জনবলের দক্ষতা বৃদ্ধি করে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা। এসেট প্রকল্প ৫ বছর মেয়াদী যা বাংলাদেশ সরকার এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এসেট প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (৪৩০০ কোটি টাকা) যার মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের ব্যয় ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বিশ্বে ব্যাংক লোন ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
জানা গেছে, রাজধানীর অদূরে গাজীপুরে গড়ে উঠছে আন্তর্জাতিক মানের মডেল পলিটেকনিক অ্যাসেট প্রকল্পের আওতায় গাজীপুরে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে একটি আন্তর্জাতিক মানের মডেল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। এই প্রতিষ্ঠানে দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থীরা পড়ার সুযোগ পাবে। আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ও সিলেবাস থাকবে। এছাড়া থাকবে ক্রেডিট ট্রান্সফারের সুযোগ। সিঙ্গাপুরের নানিয়াং পলিটেকনিক ইন্টারন্যাশনাল এর কারিগরি সহায়তায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হবে। বর্তমানে জমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
জানা গেছে, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ৫০,৮৩৩ জন প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। তাদের প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মসংস্থানে প্রবেশ করেছেন। বর্তমানে আরও ৯৩,৮১৯ জনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এ ছাড়া ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ১৭২টি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে ৮৮৬ কোটি টাকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ অর্থ দিয়ে আধুনিক ল্যাব স্থাপন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিল্প প্রতিষ্ঠানে সংযুক্তি, শিল্প পরিদর্শন, অতিথি বক্তৃতা, চাকরি মেলা এবং কারিগরি শিক্ষায় ভর্তি বাড়াতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৪,৭১৮ জন শিক্ষক ও কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, যা কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণে ১ লাখ ৩৩ হাজার দক্ষ জনশক্তি অ্যাসেট প্রকল্পের অন্যতম বড় উদ্যোগ হলো স্বল্পমেয়াদি দক্ষতা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। দেশব্যাপী সরকারি-বেসরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৪৩টি চাহিদাসম্পন্ন পেশায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য ২ লাখ ৩ হাজার প্রশিক্ষণার্থী। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ১,৩৩,৬৩৭ জন প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, এর মধ্যে ৪৭,৭৫৮ জন নারী, এছাড়া ৮৯০ জন প্রতিবন্ধী ২,৮২৯ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্য প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। প্রশিক্ষণ শেষে প্রায় ৮০ শতাংশ প্রশিক্ষণার্থী দক্ষতা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন এবং ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছেন।
শিল্পকারখানায় সরাসরি প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থানে ৯০% সফলতা প্রকল্পের দ্বিতীয় কম্পোনেন্টের আওতায় শিল্প প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরাসরি কর্মক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য ২ লাখ ২২ হাজার ৫০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া। এ পর্যন্ত ৩৩টি ইন্ডাস্ট্রি পার্টনারের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে্। প্রায় ১,০০০ শিল্প প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ পরিচালিত হচ্ছে।
অভিজ্ঞ শ্রমিকদের জন্য সরকারি সার্টিফিকেট প্রকল্পের আওতায় চালু হয়েছে Recognition of Prior Learning (RPL) কর্মসূচি। এর মাধ্যমে অভিজ্ঞ কিন্তু সার্টিফিকেটবিহীন শ্রমিকদের দক্ষতার স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য ১ লাখ ২৩ হাজার কর্মীকে সার্টিফিকেট প্রদান। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ৭৯,১৯০ জনের মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়েছে প্রায় ৮৭ শতাংশ কম্পিটেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।
এতে দক্ষ শ্রমিকদের বিদেশে কাজের সুযোগ ও আয় বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
স্কিলস কম্পিটিশন ও চাকরি মেলা কারিগরি শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী দক্ষতা বাড়াতে প্রতিবছর স্কিলস কম্পিটিশন আয়োজন করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ২০২৩ ও ২০২৫ সালে দুটি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রায় ৫ হাজার উদ্ভাবনী প্রকল্প প্রদর্শিত হয়েছে
এছাড়া, ১০৪টি চাকরি মেলা আয়োজন করা হয়েছে ১,৮০০ প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে, ২,৩৮৬ জন তাৎক্ষণিক চাকরি পেয়েছেন।
বিদেশে প্রশিক্ষণ পাবেন দুই হাজার শিক্ষক কারিগরি শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রায় ২,০০০ শিক্ষক ইতোমধ্যে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন সিঙ্গাপুর, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে প্রশিক্ষণ চুক্তি প্রক্রিয়াধীন এতে ১,৫০০–২,০০০ শিক্ষক বিদেশে প্রশিক্ষণ পাবেন।
ডিপ্লোমা পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে সক্ষমতা বাড়াতে ৮৮৬ কোটি টাকার চুক্তি প্রকল্পের প্রথম কম্পোনেন্টের আওতায় সরকারি ও বেসরকারি ডিপ্লোমা পর্যায়ের কারিগরি ও স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়াতে Institutional Development Grant (IDG) দেওয়া হচ্ছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে মোট ২২০টি প্রতিষ্ঠানকে অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কারিগরি প্রতিষ্ঠানের জন্য সর্বোচ্চ ৬ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের এই সময়কে কাজে লাগাতে দক্ষতা উন্নয়নই সবচেয়ে কার্যকর পথ। অ্যাসেট প্রকল্প সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অ্যাসেট প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। দক্ষ জনশক্তি তৈরি হলে একদিকে যেমন দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে, অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক যুবক-যুবতী দেশ-বিদেশে মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে।