নিজস্ব প্রতিবেদক :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতটি আসনে জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তারা সবাই আগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিজ নিজ আসনে বিজয়ী হওয়ায় তারা এলাকায় ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে পরিচিতি পান।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। শেরপুর-৩ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর প্রার্থী মৃত্যুবরণ করায় সেখানে ভোট স্থগিত করা হয়। বেসরকারি ফল অনুযায়ী, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পেয়ে প্রায় দুই দশক পর সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি।
২৯৭টি আসনের ফলাফলে বিএনপি ও জোটভুক্ত দলগুলো পেয়েছে ২১২টি আসন। জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্ররা পেয়েছে ৭৭টি আসন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি আসনে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সাতটি আসনে জয় পেয়েছেন।
বিএনপির শরিক দলগুলোর জন্য ছেড়ে দেওয়া ১৬টি আসনের মধ্যে ১২টিতেই স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থীরা মাঠে ছিলেন। এর ফলে তৃণমূলের ভোট বিভক্ত হয়ে যায়, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে জোটের প্রার্থীদের ওপর।
আসনভিত্তিক ফলাফল ও ব্যবধান :
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ) আসনটি জমিয়তের সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে ছেড়ে দেয় বিএনপি। তবে ধানের শীষ না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বহিষ্কৃত হন বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। হাঁস প্রতীকে বড় ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ৩৭ হাজার ৫৬৮ ভোট বেশি পেয়েছেন। ১৫১ কেন্দ্রে হাঁস প্রতীক পেয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার ৪৯৫ ভোট। তার নিকটবর্তী প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি জোটের প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৯২৭ ভোট।
কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) এ আসনে প্রাথমিকভাবে দলের মনোনয়ন পান বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল। পরে এই আসনটিতে চূড়ান্তভাবে ধানের শীষ পান বাংলাদেশ জাতীয় দল ছেড়ে আসা সৈয়দ এহসানুল হুদা। ১২ দলীয় জোটভুক্ত বাংলাদেশ জাতীয় দলের এই চেয়ারম্যান বিএনপিতে যোগদান করে ‘ধানের শীষ’ পান। পরে ইকবাল স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে তাকে বহিষ্কার করে বিএনপি। বিএনপির এই বিদ্রোহী প্রার্থী ১৩ হাজার ৯২ ভোট বেশি পেয়ে জয়লাভ করেছেন। শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল হাঁস প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৭৯ হাজার ২১০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দী ধানের শীষের প্রতীক নিয়ে সৈয়দ এহসানুল হুদা হেয়েছে ৬৬ হাজার ১১৮ ভোট।
টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনটিতে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ওবায়দুল হক নাসিরকে প্রার্থী করে দল। ধানের শীষ না পেয়ে এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হন বিএনপির সাবেক মন্ত্রী লুৎফর রহমান খান আজাদ। তিনি মোটরসাইকেল প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৬ হাজার ৭৯৪ ভোট। তার প্রতিদ্বন্ধী বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট এস এম ওবায়দুল হক নাসির ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ৮১ হাজার ৭৩৪ ভোট।
চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) এ আসনে দলের রাজস্ব ও ব্যাংকিংবিষয়ক সম্পাদক সাবেক এমপি লায়ন হারুনুর রশীদকে প্রার্থী করে বিএনপি। জেলার সর্বাধিক প্রবাসী অধ্যুষিত এ আসনটি বিএনপির অপ্রতিদ্বন্দ্বী দুর্গ হিসেবে পরিচিত। তবে ধানের শীষ না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে বহিষ্কার হন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল হান্নান। তিনি পেয়েছেন ৭৩ হাাজার ৫৯৯ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষ প্রতিকের প্রার্থী মো. হারুনুর রশিদ পেয়েছেন ৬৭ হাজার ৮৩৩ ভোট এবং জামায়াতের মো. বিল্লাল হোসেন মিয়াজী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৬২ হাজার ২৭৩ ভোট।
কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) বিএনপিতে যোগদান করে কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসন থেকে ‘ধানের শীষ’ পান এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ। আর ধানের শীষ না পেয়ে এখান থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বহিষ্কৃত হন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আতিকুল আলম শাওন। শাওন ৪২ হাজার ৮৯৪ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। প্রাপ্ত ভোট ৯০ হাজার ৮১৯। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির রেদোয়ান আহমেদ পেয়েছেন ৪৭ হাজার ৯২৫ ভোট।
ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া) আসনে ধানের শীষ পান বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। ধানের শীষ না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সালমান ওমর রুবেল। এ জন্য তিনি দল থেকে বহিষ্কৃত হন। নির্বাচনের ফলাফলে ১ লাখ ৭ হাজার ২৪১ ভোট পেয়ে জয়ী হন সালমান ওমর। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষের প্রার্থী সৈয়দ এমরান সালেহ পেয়েছেন ১ লাখ ৭৩৬ ভোট। জীবনে প্রথম ভোটে অংশ নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন সালমান ওমর।
দিনাজপুর-৫ (পার্বতীপুর-ফুলবাড়ী) আসনটিতে ব্যারিস্টার এ কে এম কামরুজ্জামানকে প্রার্থী করে বিএনপি। তবে ধানের শীষ না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় বহিষ্কৃত হন রেজওয়ানুল হক। বিএনপির বিদ্রোহী হিসেবে নির্বাচন করে ১ লাখ ১৪ হাজার ৪৮৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন রেজওয়ানুল হক। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এনসিপির ডা. আব্দুল আহাদ (শাপলা কলি) পেয়েছেন ১ লাখ ১০ হাজার ১৯৫ ভোট। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার একেএম কামরুজ্জামান (ধানের শীষ) পেয়েছেন ৯৮ হাজার ৫৪৪ ভোট।