অস্টিওপোরোসিস একটি নীরব রোগ : ডা. জুবাইদা রহমান

জাতীয় প্রচ্ছদ স্বাস্থ্য
Spread the love

নিজস্ব প্রতিবেদক :
জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান বলেছেন, অস্টিওপোরোসিস একটি নীরব রোগ। এ রোগে হাড় দুর্বল, পাতলা ও ছিদ্রযুক্ত হয়ে পড়ে, ফলে হঠাৎ হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এর কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম করার সক্ষমতা কমে যায়। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল ভবনের কনভেনশন হলে বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) ‘অস্টিওপোরোসিস: প্রতিরোধযোগ্য মহামারি’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে।

ড্যাবের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ড্যাবের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, ড্যাবের মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল, ডা. আব্দুস সালাম এমপি বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন।

সেমিনারে বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে প্রশ্নোত্তর পর্ব, প্যানেল আলোচনা ও কুইজ অনুষ্ঠিত হয়। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন অধ্যাপক ডা. এরফানুল হক সিদ্দিকী, অধ্যাপক ডা. ফারুক কাশেম, অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন, অধ্যাপক ডা. শামীম আহমেদ, ডা. শেখ ফরিদ আহমেদ এবং অধ্যাপক মোহাম্মদ বেলালুল ইসলাম।

সেমিনারে প্রধান অতিথি ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ অস্টিওপোরোসিসের কারণে হাড় ভাঙা ও দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের সব অঞ্চলের মানুষের কাছে রোগটির প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়। তবে বর্তমানে আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। আক্রান্ত বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

উত্তর-মধ্য বাংলাদেশের ৪৫ থেকে ৮০ বছর বয়সি নারীদের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ওই গবেষণায় অস্টিওপোরোসিসের প্রাদুর্ভাব পাওয়া গেছে ৪০ শতাংশ এবং অস্টিওপেনিয়ার প্রাদুর্ভাব ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৮৩ শতাংশের বেশি নারীর হাড়ের ঘনত্বে ঘাটতি ছিল। এ ছাড়া শহরাঞ্চলে ৪৬ থেকে ৬৫ বছর বয়সি নারীদের ওপর পরিচালিত একটি পুরোনো হাসপাতাল ভিত্তিক গবেষণায় অস্টিওপোরোসিসের প্রাদুর্ভাব ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং অস্টিওপেনিয়ার প্রাদুর্ভাব ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ পাওয়া যায়।

ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর নারীরা উন্নত দেশগুলোর নারীদের তুলনায় এ রোগে বেশি আক্রান্ত হন। বাংলাদেশে কতসংখ্যক নারী অস্টিওপোরোসিসে ভুগছেন, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নির্ধারণ করা কঠিন। তাই রোগটির প্রকৃত চিত্র নিরূপণে আরও গবেষণা ও নিয়মিত স্ক্রিনিং প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, কন্যাশিশু ও তরুণীদের জন্য উপযুক্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে ভবিষ্যতে অস্টিওপোরোসিস এবং এ রোগের জটিলতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।

অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে কয়েকটি পদক্ষেপের প্রস্তাব তুলে ধরে ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, প্রথমত, একটি অস্টিওপোরোসিস সোসাইটি গঠন করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে সমন্বিতভাবে দেশের ৬৪টি জেলায় সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা সম্ভব হবে। কোনো অঞ্চলের মানুষ যেন সচেতনতা ও স্ক্রিনিং কার্যক্রমের অভাবে এ রোগের ব্যথা ও দুর্ভোগে না ভোগেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, চিকিৎসক সমাজ জনগণকে অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করতে এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি নিয়োজিত এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমেও দেশব্যাপী এ রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, প্রতিবছর অস্টিওপোরোসিস সচেতনতা মাস পালনের প্রস্তাব দেন তিনি। এ উপলক্ষে নিয়মিত অনুষ্ঠান, র‌্যালি ও জনসচেতনতামূলক প্রচারাভিযানের আয়োজন করা যেতে পারে। জেলা হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের জন্য আধুনিক রোগ নির্ণয় পদ্ধতি নিয়ে সেমিনার আয়োজনের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিষয়ক সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি, হাড়ের খনিজ ঘনত্ব কমে যাওয়া এবং শৈশবে ক্যালসিয়াম গ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত পুষ্টিগত বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। এসব বিষয়ে শিক্ষাবিদ ও চিকিৎসা-অঙ্গনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করতে পারেন। তিনি হাড়ের খনিজ ঘনত্ব নির্ণয়ে স্ক্রিনিং ক্যাম্প আয়োজন এবং নিয়মিত বিরতিতে কমিউনিটি ভিত্তিক স্ক্রিনিংয়ের সুযোগ তৈরির আহ্বান জানান। যেসব এলাকায় হাড়ের খনিজ ঘনত্ব নির্ণয়ের ব্যবস্থা নেই, সেখানে ফ্র্যাকচার রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট টুল ব্যবহার করে হাড় ভাঙার ঝুঁকি মূল্যায়নের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।

ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, অস্টিওপোরোসিসের পরিণতি কমাতে দেশব্যাপী সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ, রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রসঙ্গত, ‘আজীবন হাড় গড়ুন, সুরক্ষা দিন ও শক্তিশালী করুন’ প্রতিপাদ্যে এবারের কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে, বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা দিচ্ছে ইনসেপ্টা।
হাড়ের ক্ষয়জনিত রোগ অস্টিওপোরোসিস সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর ২০ অক্টোবর বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস পালন করা হয়। এ রোগে হাড় দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে, ফলে হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *