জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র মাইলফলক : বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব

জাতীয় প্রচ্ছদ
Spread the love

নিজস্ব প্রতিবেদক :
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মোঃ আনোয়ার হোসেন বলেছেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এ প্রকল্প দেশের জন্য একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রথম ধরনের উদ্যোগ। আইএইএ (IAEA), বায়েরা (BAERA), বায়েকের (BAEC) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহের সহযোগিতায় এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। রবিবার ( ১৮ অক্টোবর ২০২৬) বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ( বায়েরা) কর্তৃক আয়োজিত বেসিক প্রফেশনাল ট্রেনিং কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
​বিজ্ঞান সচিব তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ক্রিটিক্যালিটি গত ১১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে সফলভাবে অর্জিত হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই জাতীয় গ্রিডে সংযোগ প্রদানের মাধ্যমে এটি দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখবে। দেশের তরুণ বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়ারদের আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞতা দিয়ে সমৃদ্ধ করার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।

​তিনি আরও বলেন, পারমাণবিক খাতে শুধু উৎপাদনই শেষ কথা নয়; এর অপারেশন, রেগুলেশন এবং নিরাপত্তার (Safety Culture) বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রাতিষ্ঠানিক ও অপারেশনাল উভয় স্তরেই সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তি একা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, এজন্য এর সাথে সংশ্লিষ্ট জনবলকেও প্রশিক্ষিত ও সচেতন হতে হবে।
​অনুষ্ঠানে (নবীন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী) প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশ্যে সচিব বলেন, আইএইএ-এর বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে হবে এবং কোনো রকম দ্বিধা বা সংকোচ না রেখে নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে হবে। এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি দেশের পারমাণবিক খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনে অনন্য ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের পারদর্শিতা প্রশংসনীয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, IAEA-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের ন্যায্য স্থান ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
​বক্তব্যে বিজ্ঞান সচিব আগামী ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়রা) থেকে প্রতি বছর ৩ থেকে ৫ জন আন্তর্জাতিক মানের রেগুলেটর তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন, যারা দেশের অভ্যন্তরীণ কাজের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও গবেষণা সংস্থায় অবদান রাখবেন।

প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে তিনি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর জোর দেন: পরমাণু শক্তি ব্যবহারে ‘নিরাপত্তা সংস্কৃতি’ (Safety Culture) গড়ে তোলা, মানবসম্পদ ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তবে প্রয়োগ করে সেবা ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করা। বক্তব্য শেষে তিনি প্রশিক্ষণ কোর্সের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন এবং সকলের সফলতা কামনা করেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি বক্তৃতায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মঈনুল ইসলাম বলেন, প্রশিক্ষণ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া যা কর্মক্ষেত্রের দক্ষতা, জ্ঞান ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে। ১৯৯৮ সালে আইএইএ কর্তৃক প্রণীত এই প্রশিক্ষণ কোর্সটি পরমাণু শক্তি কেন্দ্রের নিরাপত্তা এবং কার্য পরিচালনার প্রতিটি ধাপে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে। তিনি উল্লেখ করেন, এই কোর্সের মাধ্যমে পারমাণবিক পদার্থবিদ্যা, রেডিয়েশন প্রোটেকশন, নিউক্লিয়ার রিয়েক্টর ডিজাইন, ফুয়েল সাইকেল, ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট এবং সেফটি অ্যাসেসমেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।

বায়েক চেয়ারম্যান আরও আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, অংশগ্রহণকারীরা এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করে দেশে একটি নিরাপদ, সুরক্ষিত ও টেকসই পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচি গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা)’র চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রতিনিধিদের স্বাগত জানিয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নে সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাটির প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

বায়রা চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান আরও বলেন, বাংলাদেশ যেভাবে তার শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচিতে এগিয়ে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে, সে প্রেক্ষাপটে যেকোনো পারমাণবিক ও তেজস্ক্রিয় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর প্রস্তুতি নিশ্চিত করা জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে নিশ্চিত করতে রয়েছে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অঞ্চলের অতিরিক্ত সচিব আবুল খায়ের মোঃ আক্কাস আলী এবং সম্মানিত অতিথির বক্তব্য রাখেন আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এর টেকনিক্যাল অফিসার রাহিলা হাম্মাদ প্রমুখ।
চার সপ্তাহের এ প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠানে আইএইএ হতে আগত ০৪ জন (কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞ) টেকনিক্যাল অফিসার রাহিলা হাম্মাদ; আইএইএ অফিসার বেনোইট গ্যাব্রিয়েল; আইএইএ বিশেষজ্ঞ: মেহমেত তোম্বাকোগলু; আইএইএ বিশেষজ্ঞ বারিস গুরনার-সহ দেশীয় বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞগণ প্রশিক্ষণ প্রদান করবেন।

অনুষ্ঠানে বায়েরা, বায়েক এবং এনপিসিবিএল-এর বিভিন্ন পর্যায়ের ৪০ জন (নবীন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী) প্রশিক্ষণার্থীসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য যে, বেসিক প্রফেশনাল ট্রেনিং কোর্স (বিপিটিসি) ১৮ই অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে আগামী ১২ ই নভেম্বর ২০২৬ খ্রি. পর্যন্ত চলবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *